আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

কুলির আয়েও ভাগ বসান ‘মাছ কাদের’

news-image

চট্টগ্রাম নগরীর মোগলটুলীর ছোট্ট একটি বাজারে একসময় মাছ কেটেকুটে পরিষ্কার করে দেওয়ার শ্রমিকের কাজ করতেন মো. আবদুল কাদের (৪৫)। সেখানে কাজ করতে করতে তার পরিচিতি দাঁড়ায় ‘মাছ কাদের’ নামে। ওই কাজের পাশাপাশি তিনি এলাকার উঠতি বয়সীদের নিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন নিজস্ব একটি গ্রুপ। জড়িয়ে পড়েন চাঁদাবাজিসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। আর প্রথমদিকে ছোটখাটো অপরাধে জড়ালেও পরে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও হত্যাসহ ভয়ংকর সব অপরাধ যেন তার জন্য ডাল-ভাতে পরিণত হয়। এই মাছ কাদেরই পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশ ও র‌্যাবের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। একে একে ২৯টি মামলা হয় কাদের ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। তবে ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে সখ্য গড়ে অতীত সেসব অপকর্ম ধামাচাপা দিয়ে মাছ কাদের এখন জনপ্রতিনিধি। চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক এলাকাখ্যাত আগ্রাবাদের ২৮ নম্বর পাঠানটুলী ওয়ার্ডের কাউন্সিলর।

নামে জনপ্রতিনিধি হলেও চট্টগ্রাম নগর যুবলীগের প্রভাবশালী এ সদস্য এখনো আগ্রাবাদ কমার্স কলেজ ও পাঠানটুলী ছাড়াও নগরীর বড় একটি অংশের এলাকার বাসিন্দাদের কাছে এক আতঙ্কের নাম। জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার পর ভয়ে এখন আর কাদেরের সম্পর্কে মুখ খুলতে চায় না এলাকাবাসী।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আবদুল কাদের ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মহানগর যুবলীগের সদস্য হওয়ায় প্রশাসনসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে তার বেশ সখ্য। জনপ্রতিনিধি পদের আড়ালে স্থানীয় বেশকিছু যুবককে নিয়ে তিনি একটি গ্রুপ গড়ে তুলে এলাকায় নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। সম্প্রতি সারা দেশে সরকারের শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ার পর কাউন্সিলর কাদেরও আত্মগোপনে চলে যান। ওই অভিযানে কিছুটা শিথিলতা এলে আবারও প্রকাশ্যে চলে আসেন তিনি। এছাড়া গত বছর যখন দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়, তখনো কাউন্সিলর কাদের ওমরাহ পালনের নামে দেশত্যাগ করেছিলেন। ওই সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চট্টগ্রামে মাদক কারবারি ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের যে তালিকা করেছিল, সেখানে কাউন্সিলর কাদেরের নামও ছিল। ১৯৯৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে হত্যা, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও অস্ত্র আইনেসহ নানা অভিযোগে নগরীর বিভিন্ন থানায় মোট ২৯টি মামলা হয় কাদের ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। ২০০০ সালে একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে টানা ৯ বছর কারাগারে ছিলেন তিনি। আরেকটি খুনের মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। বাকি ২৭টি মামলার মধ্যে ২৩টিতে বেকসুর খালাস পেয়েছেন এবং বর্তমান সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় তার চারটি খুনের মামলা প্রত্যাহার করা হয়। এসব চাঞ্চল্যকর মামলার বাইরেও কাদেরের বিরুদ্ধে এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি ও ফ্ল্যাট দখল, টেন্ডারবাজি এবং মাদক কারবার ও একাধিক কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে এলাকাবাসীর। কিন্তু এতকিছুর পরও ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়ে পাঠানটুলী ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন কাদের। এলাকাবাসীর ভাষ্য, মাছ কাদের তার ক্যাডার বাহিনী নিয়ে ভোটার ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ওই নির্বাচনে জয়লাভ করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৭ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ছাত্র শফিউদ্দিন আজাদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেই মামলার প্রধান আসামি আবদুল কাদের। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে মামলাটির কার্যক্রম ২০০০ সাল থেকে বন্ধ আছে। শফিউদ্দিন আজাদ ছাড়াও কাদেরের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম নগরীর পলিটেকনিক কলেজের ছাত্র কাদের, মোগলটুলী এলাকার আজাদ, আলী, সিরাজ, পাহাড়তলী থানা ছাত্রলীগ সভাপতি নাসিম, পশ্চিম মাদারবাড়ীতে জোড়া খুন ও মিজানসহ নয়জন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া জননিরাপত্তা বিঘœকারী অপরাধ দমন আইনের একটি মামলায় ১২ বছরের সাজা হয় কাদেরের। তবে ওই মামলায় উচ্চ আদালতে আপিল করে বর্তমানে জামিনে আছেন তিনি। মামলাটি এখনো উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায়।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে আগ্রাবাদ এলাকার ভুক্তভোগী এক ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাউন্সিলর হয়ে মাছ কাদের আগ্রাবাদ ব্যাংকপাড়ার সড়কগুলোতে টাকার বিনিময়ে ছোট ছোট ভ্যানগাড়ি ও দোকান বসিয়ে প্রায় ৫০০ হকারের কাছ থেকে মাসে লাখ লাখ টাকা ভাড়া তোলে। এছাড়া পিডিবির লাইন থেকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে রাস্তার ওপর বসানো দোকানিদের কাছ থেকে প্রতি মাসে ১৫০ টাকা করে আদায় করছে। কোনো হকার যদি দৈনিক ও মাসভিত্তিক নির্ধারিত চাঁদা না দেয়, তাহলে মাছ কাদেরের সন্ত্রাসী বাহিনী তাদের মারধর ও নির্যাতন করে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাছ কাদেরের দখল বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ও দেখভাল করে তার সহযোগী আলমগীর আলো ওরফে পিচ্চি আলো। ডবলমুরিং থানার তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী এই পিচ্চি আলো ইয়াবা কারবারের সঙ্গেও জড়িত বলে এলাকাবাসীর ভাষ্য।

কুলির আয়ের টাকায়ও ভাগ বসান কাদের : গত বুধবার নগরীর বাংলাবাজার ঘাট এলাকায় গিয়ে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় সেখানকার এক শ্রমিকের। তিনি প্রতিদিন বাংলাবাজার ঘাটে পণ্যবাহী ট্রাক ও লরিতে মালামাল ওঠানো-নামানোর কাজ করেন। কিন্তু তাকেও দিনশেষে শরীরের ঘাম ঝরানো কষ্টার্জিত আয়ের টাকার একটি ভাগ তুলে দিতে হয় কাউন্সিলর কাদেরের লোকজনের হাতে। ভুক্তভোগী এই দিনমজুর বলেন, ‘আমরা সারাদিন শ্রম দিয়ে মালামাল ওঠানামা করি। কিন্তু এখান থেকেও প্রতিদিন একটি সন্ত্রাসী গ্রুপকে চাঁদা দিতে হয়। সারাদিন শ্রম দিয়ে ট্রাকে মাল ওঠানামা করে ৫০০ টাকা আয় পাইলে, সেখান থেকে ৮০ থেকে ১০০ টাকা তাদের (সন্ত্রাসী গ্রুপ) দিয়ে ফেলতে হয়।’

এ ব্যাপারে সেখানকার এক শ্রমিক নেতার কাছে জানতে চাইলে প্রাণনাশের ভয়ে প্রথমে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ করা হবে না বলে আশ্বস্ত করা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি থেকে শ্রম ঘণ্টার ওপর ৫০ পয়সা থেকে দেড় টাকা কমিশন দিতে হয় কাউন্সিলরকে (আবদুল কাদের)। এছাড়া প্রতি টন পণ্যের লোডিং-আনলোডিংয়ের ক্ষেত্রেও ২০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। কাউন্সিলর কাদেরের ছত্রছায়ায় থাকা জাফরসহ আরও কয়েকজন কথিত শ্রমিক নেতা এসব চাঁদা তুলে থাকে।’

জমি ও ভবন দখল, টেন্ডারবাজি এবং মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণে কাদের : স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জমি ও ভবন দখলসহ এলাকায় যত ধরনের অপকর্ম হয়ে থাকে তার অধিকাংশেরই নেপথ্যে থাকেন কাউন্সিলর কাদের। আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় রামকৃষ্ণ মিশন ভবন দখল করে ভাড়া আদায় করছে কাদেরের সহযোগীরা। এছাড়া বিদ্যুৎ ভবনের দরপত্রও নিয়ন্ত্রণ করেন তার এসব সহযোগী। অন্যদিকে নগরীর পাঠানটুলী, মগপুকুরপাড়, ডেবারপাড় ও মোগলটুলী এলাকায় ইয়াবাসহ নানা মাদকদ্রব্যের কারবার ও জুয়ার আসর বসে। কাউন্সিলর কাদেরের সহযোগীরাই এসব করছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

এদিকে সারা দেশে শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও স্থানীয় প্রশাসন সন্ত্রাসী ও অবৈধ সম্পদ অর্জনকারীদের তালিকা করছে বলে জানা গেছে। ওই তালিকায় অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী হিসেবে কাউন্সিলর কাদেরের নাম স্থান পেয়েছে বলে জানতে পেরেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক পদের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় দুর্নীতিবাজদের তালিকা করা হচ্ছে। তালিকাতে চট্টগ্রামেরও একাধিক জনপ্রতিনিধি আছে। তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। কোনো অপরাধী যাতে পার না পায়, সেজন্য সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনা রয়েছে।’

তার বিরুদ্ধে ওঠা বিস্তর অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে কাউন্সিলর মো. আবদুল কাদের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এলাকায় কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত চার বছরে ৫০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ করেছি। আরও বেশ কয়েকটি প্রকল্প চলমান। যখন ছাত্ররাজনীতি করতাম তখন আমার বিরুদ্ধে মামলা ছিল। এখন আমার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। সব মামলা থেকে আমি খালাস পেয়েছি। চাঁদাবাজি ও দখলসহ যেসব অভিযোগের কথা বলা হচ্ছে তার সবই ভিত্তিহীন। এলাকার একটা চিহ্নিত গ্রুপ ঈর্ষান্বিত হয়ে আমার বিরুদ্ধে এসব কুৎসা রটাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কয়েকজন মাদক কারবারির একটি তালিকা তৈরি করে আমি প্রশাসনকে দিয়েছি। এতে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে এসব বিষয়ে আমার ও আমার লোকজনের বিরুদ্ধে বানোয়াট কথাবার্তা ছড়াচ্ছে।’

অন্যদিকে বাংলাবাজার ঘাটে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কাউন্সিলর কাদের বলেন, ‘আমার সঙ্গে কার্গো জাহাজ মালিক সমিতির যোগাযোগ রয়েছে। আমি সেখানে শ্রমিক সাপ্লাই দিয়ে থাকি। এইটা আমার ব্যবসা। শ্রমিকদের মজুরি থেকে কোনো কমিশন নেওয়া হয় না।’

নানা অপকর্মের অভিযোগ থাকলেও কাউন্সিলর কাদেরের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মাহাবুবর রহমান বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া অনেক মামলাও ছিল। এখন হয়তো জামিনে আছে। যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাদেরের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’