আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

অনিশ্চয়তা নিয়েই চালু হলো শিমুলিয়া-মাঝিকান্দি ফেরি

পন্টুন বসানোর প্রায় সাড়ে ৩ মাস পর শুরু হলো শিমুলিয়া-মাঝিকান্দি রুটের ফেরি চলাচল। মঙ্গলবার সকালে ৪০টির মতো ছোট যানবাহন নিয়ে বিআইডব্লিউটিসির ফেরি কুঞ্জলতা শিমুলিয়া থেকে ছেড়ে আসে শরীয়তপুরের মাঝিকান্দি ঘাটের উদ্দেশে। নতুন এই রুট চালুর মাধ্যমে মাওয়া হয়ে ঢাকাগামী যানবাহনের চলাচল সহজ হবে বলে আশা করা হলেও সার্ভিসটি কতদিন চালু রাখা যাবে তাই নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কর্তাব্যক্তিরা।
নতুন এই রুটে ৮ কিলোমিটার পথের প্রায় ৫ কিলোমিটারজুড়েই রয়েছে নাব্য সংকট। রুট চালু প্রশ্নে এরই মধ্যে প্রায় ৪১ লাখ ঘনমিটার নদী খনন করতে হয়েছে বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগকে। বর্তমানে যে হারে পানি কমছে তাতে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ড্রেজিং করতে হবে আরও ৪ লাখ ঘনমিটারের বেশি। তাছাড়া ফি বছর শুকনো মৌসুমের পুরোটা সময় ড্রেজিং করেই সচল রাখতে হবে নতুন রুট। এদিকে নদী ভাঙনের ভয়ে লৌহজং টার্নিং পয়েন্ট থেকে মাঝিকান্দি পর্যন্ত ড্রেজিংয়ে বাধা দিচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দারা।

সবকিছু মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত এই রুট চালু রাখা যাবে কিনা সেটা নিয়েই দেখা দিয়েছে সংশয়। আশার কথা হলো, সমস্যা সমাধানে মঙ্গলবার সভা হয়েছে জাজিরা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরে। সেখানে নদীভাঙন রোধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। দাবি পূরণ হলে ড্রেজিংয়ে বাধা থাকবে না এমনটাই আশা বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের।

পদ্মা সেতুর পিলারে পরপর ৪ বার ফেরির ধাক্কা লাগার পর জটিলতা বাধে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটের ফেরি চলাচলে। সীমিত হয়ে যায় এই রুটের ফেরি সার্ভিস। পিলারে ধাক্কা লাগার কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয় পদ্মার তীব্র সে াতের বিষয়টি। পরে ১৮ আগস্ট থেকে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয় টিসি। বিপাকে পড়ে বরিশাল ও খুলনা বিভাগসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষ। চাপ বাড়ে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরি পয়েন্টে। দুই থেকে ৩ হাজার বাড়তি যানবাহনের কারণে প্রতিদিনই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হতে থাকে ফেরি পয়েন্টের উভয় প্রান্তে। এর সঙ্গে যোগ হয় ১১০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দেওয়া প্রশ্নে বাড়তি জ্বালানি এবং অতিরিক্ত সময় ব্যয়ের বিষয়টি। সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগ নিরসনে পদ্মা সেতু এড়িয়ে বিকল্প রুটে ফেরি চালানোর লক্ষ্যে ২৬ আগস্ট শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার মাঝিকান্দি ঘাটে স্থাপন করা হয় নতুন ফেরি পয়েন্ট। পরীক্ষামূলকভাবে ফেরি চালাতে গিয়ে ধরা পড়ে নাব্য সংকটের বিষয়টি। টিসির ফেরিগুলো চলতে যেখানে কমপক্ষে ৭ ফিট গভীরতা দরকার সেখানে অধিকাংশ জায়গায় গভীরতা মেলে ৬ ফিটেরও কম। ফলে থমকে যায় নতুন রুটে ফেরি চালানোর উদ্যোগ।

এদিকে পদ্মায় স্রোতের তীব্রতা হ্রাস পাওয়ায় চলতি বছরের ৮ নভেম্বর থেকে পুনরায় শুরু হয় শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটের ফেরি চলাচল। পদ্মা সেতুর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভোর ৬টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত মাত্র ১০ ঘণ্টার জন্য চলতে শুরু করে ফেরি। তাছাড়া বন্ধ রাখা হয় বাস-ট্রাকসহ বড় গাড়ির পারাপার। প্রাথমিকভাবে এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক মনে হলেও ফেরি চালু হওয়ার পর বাধে বিপত্তি। মাত্র ৪টি ফেরি দিয়ে যানবাহন পারাপারে দেখা দেয় জটিলতা। তার ওপর দিনে মাত্র ১০ ঘণ্টা ফেরি চলায় ঘাটে এসে ফেরি না পাওয়া আর যানবাহনের চাপে ফেরিতে উঠতে না পেরে আরও বিপাকে পড়ে মানুষ। এভাবে মাসখানেক চলার পর সমস্যা সমাধানে পুনরায় নেওয়া হয় শিমুলিয়া-মাঝিকান্দি রুটে ফেরি চালানোর উদ্যোগ। ৪ ডিসেম্বর শনিবার পরীক্ষামূলকভাবে শিমুলিয়া থেকে যানবাহন নিয়ে মাঝিকান্দি আসে ফেরি কুঞ্জলতা। পরে সব দিক বিবেচনা করে গতকাল মঙ্গলবার থেকে নতুন এই রুটে শুরু হয় ফেরি চলাচল। টিসির সহ-উপব্যবস্থাপক (মেরিন) আহম্মেদ আলী জানান, ‘সকাল ৭টায় শিমুলিয়া পয়েন্ট থেকে ছেড়ে যাওয়া ফেরি কুঞ্জলতা ভালোভাবেই পৌঁছেছে মাঝিকান্দি ঘাটে। রাতে আরও একটি ফেরি এই রুটে চালাব আমরা। সবকিছু ঠিক থাকলে বুধবার থেকে নিয়মিত চলবে ফেরি। শীত মৌসুমে কুয়াশা পড়তে শুরু করায় এরই মধ্যে বাংলাবাজার-শিমুলিয়া পয়েন্টে ফেরি চালানোর সময়সূচি ১০ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৮ ঘণ্টা করা হয়েছে। এখন থেকে এই রুটে ফেরি চলবে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। বাকি সময় ফেরি চলবে শিমুলিয়া-মাঝিকান্দি রুটে। বাংলাবাজার পয়েন্টে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে যেহেতু পদ্মা সেতুর নিচ দিয়ে যেতে হয় তাই কুয়াশা কিংবা রাতের ঝুঁকি নিচ্ছি না আমরা। এভাবে দুই রুটে ফেরি চললে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই পদ্মার এই পয়েন্টে যানবাহন পারাপার করতে পারব আমরা। মাঝিকান্দি রুটে যেহেতু বাংলাবাজারের তুলনায় দূরত্ব ৩ কিলোমিটার কম তাই পারাপারেও আগের তুলনায় সময় কম লাগবে।’

টিসির কর্মকর্তারা এভাবে বললেও শিমুলিয়া-মাঝিকান্দি রুটে শেষ পর্যন্ত ফেরি চলাচল অব্যাহত রাখা যাবে কিনা তাই নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। একদিকে যেমন এই রুটের প্রায় পুরোটাই রয়েছে নাব্য সংকট, তেমনি ড্রেজিং করতে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের বাধার মুখে পড়ছে টিএ। বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হারুন উর রশিদ বলেন, ‘লৌহজং টার্নিং থেকে মাঝিকান্দি পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নাব্য সংকট রয়েছে। নিম্নচাপের প্রভাবে বর্তমানে নদীতে পানি বেশি রয়েছে। তার পের রুট চালু করতে এ পর্যন্ত ৪ লাখ ৬০ হাজার ঘনমিটার পলি অপসারণ করেছি আমরা। বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে ফেরি চলতে কোনো সমস্যা না হলেও চলতি শীত মৌসুমে আরও কমবে নদীর পানি। মার্চ মাস পর্যন্ত পানি কমার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। সেক্ষেত্রে এখনই আরও ৪ লাখ ঘনমিটার পলি নদী থেকে অপসারণই কেবল নয়, মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে হবে ড্রেজিং। ফেরি চালু থাকলে প্রতিবছরই এভাবে ড্রেজিং করতে হবে এই রুটে।’ ড্রেজিং বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মতিন বলেন, ‘ড্রেজিং করে রুট চালু রাখা সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে স্থানীয়দের বাধা। লৌহজং টার্নিং থেকে মাঝিকান্দি পর্যন্ত ড্রেজিং করতে বাধা দিচ্ছে নদীর দুপারের মানুষ। ড্রেজিং হলে তাদের বাড়িঘর ভাঙনের মুখে পড়বে এমনটাই আশঙ্কা। বিষয়টি শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসককে লিখিতভাবে জানিয়েছি আমরা। মঙ্গলবার এ নিয়ে জাজিরা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে একটি সভাও হয়েছে।’

জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুজ্জামানের বরাত দিয়ে যুগান্তরের শরীয়তপুর প্রতিনিধি কেএম রায়হান কবির জানান, ‘বৈঠকে ভাঙন প্রতিরোধে নদীর দুই পারে জিও ব্যাগ এবং জিও টিউব ফেলার দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রা। বিষয়টি জানানো হয়েছে বিআইডভি­উটিএকে।’ টিএ’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হারুন উর রশিদ বলেন, ‘জিও ব্যাগ এবং জিও টিউব ফেলার বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে চিঠি দেব আমরা। আশা করি এ ব্যাপারে খুব শিগগিরই ব্যবস্থা নেবেন তারা।’ টিসির পরিচালক বাণিজ্য আশিকুজ্জামান বলেন, ‘সব সময়ই ফেরি চালানোর প্রস্তুতি রয়েছে আমাদের। সঠিক নেভিগেশন এবং নাব্য সংকট না থাকলে ধীরে ধীরে শিমুলিয়া-মাঝিকান্দি ঘাটকেই মাওয়া পয়েন্ট পদ্মা পাড়ির প্রধান পয়েন্ট করব আমরা। সেক্ষেত্রে পদ্মা সেতুর নিরাপত্তা যেমন অক্ষুণ্ন থাকবে, তেমনি যানবাহনগুলোও কম সময়ে পদ্মা পাড়ি দিয়ে রাজধানীতে যাওয়া-আসা করতে পারবে। যেহেতু পদ্মা সেতুতে ২৭ টনের বেশি ভারী যানবাহন পারাপার করা হবে না তাই সেতু চালু হওয়ার পরও শিমুলিয়া-মাঝিকান্দি ফেরির গুরুত্ব কমবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস।’