আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

অভ্যন্তরীণ নৌযান সার্ভে-রেজিস্ট্রেশনে অনিয়মের তদন্ত শুরু

অভ্যন্তরীণ নৌযান সার্ভে (ফিটনেস পরীক্ষা) ও রেজিস্ট্রেশনে অনিয়ম-দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগের প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত অবশেষে শুরু হয়েছে। নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গঠিত চার সদস্যের তদন্ত কমিটির তলবের পর সোমবার লিখিত বক্তব্য জমা দিয়েছেন অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা। এ সময় তদন্ত কমিটি অভিযোগ বিষয়ে তাদের কিছু জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রশ্ন করে। এসব প্রশ্নের জবাব দিতে আগামী সপ্তাহে আবারও তদন্ত কমিটির সামনে উপস্থিত হতে বলা হয়েছে ওই দুই কর্মকর্তাকে।
তারা হচ্ছেন অধিদপ্তরের ঢাকা (সদরঘাট) অফিসের ‘ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার’ মাহবুবুর রশিদ মুন্না (সাবেক সার্ভেয়ার, খুলনা) এবং নারায়ণগঞ্জ অফিসের ‘ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার’ শাহরিয়ার হোসেন।
তবে একসঙ্গে তিন শিপ সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ উত্থাপিত হলেও অদৃশ্য কারণে বরিশালের শিপ সার্ভেয়ার আবু হেলাল সিদ্দীকিকে তদন্তের আওতায় আনা হয়নি। এই তিন কর্মকর্তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের তদন্তের উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। এতে সংশ্নিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্র মতে, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর এজেডএম জালাল উদ্দিন গত ৩১ ডিসেম্বর এই তদন্ত কমিটি গঠন করেন। অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মনজুরুল কবীরকে আহ্বায়ক করে গঠিত চার সদস্যের কমিটির অন্য তিনজন হলেন একই সংস্থার ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার ওবায়েদ উল্লাহ ইবনে বশির, নটিক্যাল সার্ভেয়ার অ্যান্ড এক্সামিনার ক্যাপ্টেন কাজী মুহাম্মদ আহসান এবং প্রসিকিউটিং অফিসার বেল্লাল হোসাইন। কমিটিকে তদন্ত করে মতামত, সুপারিশসহ ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জনৈক এনামুল হকের করা লিখিত অভিযোগ বিষয়ে তদন্তের এ সিদ্ধান্ত এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে। গত বছরের ৯ নভেম্বর দুদকের মহাপরিচালক ও অভিযোগ যাচাই-বাছাই কমিটির আহ্বায়ক এ কে এম সোহেল স্বাক্ষরিত চিঠিতে নৌ পরিবহন সচিবকে জানানো হয়, প্রাপ্ত অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নিমিত্তে সচিব, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানোর জন্য কমিশনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ওই সিদ্ধান্ত অনুসারে বিধিমতে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অভিযোগের ছায়ালিপি পাঠানো হলো। দুদকের এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্তের জন্য নৌ মন্ত্রণালয় গত ১৩ ডিসেম্বর নৌ অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেয়।

এনামুল হকের দুই পৃষ্ঠার লিখিত অভিযোগসহ এ-সংক্রান্ত কাগজপত্রের ছায়ালিপি সমকালের হাতে এসেছে। এতে দেখা যায়, লিখিত অভিযোগে তিনজন শিপ সার্ভেয়ার ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ অফিসের শিপ সার্ভেয়ারের অনিয়ম-দুর্নীতির সহযোগী হিসেবে সেখানকার হেড ক্লার্ক আনিছুর রহমান ও পিয়ন মামুনুর রহমানের নাম রয়েছে। অথচ নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের এ-সংক্রান্ত অফিস আদেশে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের সার্ভেয়ার ছাড়া অন্যদের নাম নেই।

দুদকে দাখিল করা লিখিত অভিযোগে বলা হয়, নৌ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ, খুলনা ও বরিশাল কার্যালয়ের সার্ভেয়াররা সব কর্মদিবসে কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকেও নিয়ম লঙ্ঘন করে কাগজে-কলমে নৌযান সার্ভে করছেন। নৌযান সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশনে সার্ভেয়ারদের নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা না দিলে হয়রানির শিকার হতে হয়। তবে দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে নৌযান পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন সনদ পাওয়া যায়। এভাবে এ তিন কর্মকর্তা প্রতি মাসে প্রায় এক কোটি টাকা করে আয় করছেন।

লিখিত অভিযোগপত্রে নারায়ণগঞ্জের সার্ভেয়ার শাহরিয়ার হোসেন সম্পর্কে অভিযোগ করা হয়, শাহরিয়ার হোসেন ঢাকা থেকে প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জে অফিস করেন। একদিনও দুপুর ২টার আগে সেখানে যান না এবং বিকেল ৫টার পরপরই কর্মস্থল ত্যাগ করেন। অথচ কাগজে-কলমে প্রতিদিন গড়ে ১০টি নৌযান সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন করার কথা উল্লেখ করছেন, যা মাস শেষে দাঁড়ায় প্রায় ৩০০টিতে।

অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, অন্য সার্ভেয়ার মাহবুবুর রশিদ মুন্না খুলনার সার্ভেয়ারের দায়িত্ব পালনকালে কাগজে-কলমে দৈনিক গড়ে ২০টি নৌযান সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন করেছেন। যদিও নিয়ম অনুযায়ী একজন সার্ভেয়ার দিনে সর্বোচ্চ ১০টি সার্ভে করতে পারেন। নৌযানের আয়তন ও শ্রেণিভেদে প্রতি নৌযান রেজিস্ট্রেশন বাবদ এক থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন মুন্না। আর সার্ভে বাবদ নেন নৌযানপ্রতি ৩০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত।

তদন্ত কার্যক্রম শুরু :সূত্র মতে, লিখিত বক্তব্যে অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন। তারা বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই ভিত্তিহীন। কিছু ‘দালাল’ ও ‘হলুদ সাংবাদিক’ ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করে বেড়াচ্ছেন।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য শাহরিয়ার হোসেনকে কল করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ামাত্র সংযোগ কেটে দেন। অন্য শিপ সার্ভেয়ার মাহবুবুর রশিদ মুন্না তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে ‘দুইশ ভাগ মিথ্যা’ দাবি করে সমকালকে বলেছেন, অভিযোগগুলোর মধ্যে সত্যতার লেশমাত্র নেই।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও নৌ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মনজুরুল কবীর বলেন, তদন্ত বিষয়ে টেলিফোনে কোনো কথা বলব না।