আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

আন্তর্জাতিক নারী দিবস দুঃসময়ে সংসারের হাল ধরেন নারীরা

news-image

সেতারা বিবির তিন ছেলে তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ ধরে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে মাছ ধরা বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় তাঁদের পরিবারের আয়-রোজগার বন্ধ থাকে। সেতারার স্বামী আবদুল আজিজও মাছ ধরতেন। এখন বার্ধক্যের কারণে পারছেন না। এ পরিস্থিতিতে সংসার চালাতে সহায়তা করছেন সেতারা। তিনি হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালন করেন এবং এসব বিক্রি করে সংসারের নানা প্রয়োজন মেটান।

ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর অভয়াশ্রমে ঘোষণার কারণে মার্চ ও এপ্রিল এই দুই মাস মাছ ধরা, ক্রয়–বিক্রয় ও পরিবহন নিষেধ। এ নিষেধাজ্ঞার সময় সেতারার মতো পাঁচ শতাধিক জেলে পরিবারের গৃহবধূরা সংসারের খরচ জোগাড় করতে স্বামী অথবা সন্তানদের সহায়তা করছেন।

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘নেতৃত্বে নারী: কোভিড-১৯ বিশ্বে সমান ভবিষৎ’। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সারা পৃথিবীতে নানা সংকটের সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা পেয়েছেন সাফল্য। একইভাবে ভোলায় মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় আর্থিক সংকট মোকাবিলায় জেলে পরিবারের নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ভোলার নারীদের এ উদ্যোগ দেশের অন্য এলাকার নারীদেরও নানা সমস্যা সমাধানে উদ্বুদ্ধ করবে।

পরিবারের পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি সংসারের অভাব দূর করার লড়াইয়ে এগিয়ে এসেছেন সেতারা বেগম। এই সাহসিকা নারীর বাড়ি ভোলার সদর উপজেলার মধ্য ভেদুরিয়া গ্রামে। অভিযানের সময় সংসার চালাতে তিনি সারা বছরই কিছু সঞ্চয় করেন। মাঝেমধ্যে হাঁস-মুরগি পালন। জমি বর্গা নিয়ে ছেলেদের কৃষিকাজে লাগান। সেখানে খোরাকির ধান ও সবজি হয়।

সেতারা জানান, দুই বছর আগে একটি বেসরকারি সংস্থা তাঁকে দুটি ছাগল দেয়। ওই ছাগল বেড়ে এখন ১৫টি হয়েছে। মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় তিনি দুটি খাসি বিক্রি করবেন। ব্যবসায়ীরা ৩০ হাজার টাকা দাম বলছে। আরও বেশি দাম পেলে তিনি খাসিগুলো বিক্রি করে দেবেন।

ভোলার সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের বাঁধের বাইরে বলরামসুরা ও গঙ্গাকৃতি গ্রাম। এই দুই গ্রামে শতাধিক পরিবার বাস করে। তাঁদের পেশা নদীতে মাছ ধরা। বর্তমানে এই জেলেরা বেকার। তাঁদের চাষবাষের জমি নেই। আছে মাথা গোঁজার একটু জমি।

বলরামসুরা গ্রামে ছকিনা বিবির (৪২) বাস। তাঁর চার ছেলে ও দুই মেয়ে। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। নাতি-নাতনি আছে। কিন্তু নিজেদের কোনো জমি নেই।

অন্যের জমিতে বছরে এক হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে ঘর তুলে বাস করেন। পরিবারে এখন ১০ সদস্য। স্বামী আবু তাহের ডায়াবেটিসের রোগী। ছকিনা নিজেও হৃদ্রোগ ও কিডনির সমস্যায় ভুগছেন। প্রতি মাসের সংসার খরচের সঙ্গে কয়েক শ টাকার ওষুধ কিনতে হয়। এসব খরচ আসে নদীতে ধরা মাছ বিক্রির টাকা দিয়ে। কিন্তু দুই মাস মাছ ধরার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে আবু তাহের ও তাঁর ছেলেরা বেকার।

তাহলে এ সময় সংসার চলছে কী করে, এমন প্রশ্নে ছকিনা মুচকি হাসি দিয়ে বলেন, ‘আল্লায় চালায়।’ বিষয়টি খোলাসা করতে বললে তিনি জানান, তিনি ঘরে বসে নিজেই জাল বোনেন, জেলেদের ছেঁড়া জাল ঠিক করেন, শীতলপাটি বোনেন, নদীর তীরে পরিত্যক্ত বাঁধের গায়ে সবজি আবাদ করেন। মাঝেমধ্যে কাঁথা সেলাই করেন। এসব করে যা আয় হয়, তা–ই দিয়ে স্বামীকে সংসার পরিচালনায় সহায়তা করেন।

ধনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জাকির হোসেন বলেন, ‘বলরামসুরা ও গঙ্গাকৃতি গ্রামের অধিকাংশ জেলে মৎস্য আইন মানছেন। তাঁদের জমি না থাকার পরও জেলে পরিবারের গৃহবধূরা সুসময়ে সঞ্চয় করছেন। তাঁরা হাঁস–মুরগি ও গবাদিপশু পালন করছেন। এগুলো বিক্রি করে চলছে তাঁদের সংসার।’

সদর উপজেলা ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির সভাপতি এরশাদ আলী বলেন, বলরামসুরা ও গঙ্গাকৃতি গ্রামের জেলে পরিবারগুলো সরকারি নিষেধাজ্ঞা মানছে। তাঁদের পরিবারের কমবেশি আয় থাকায় এটা সম্ভব হচ্ছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আজহারুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা জেলেনিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আয়বর্ধক কাজে যুক্ত করছে। তাঁদের মধ্যে সঞ্চয়ের মানসিকতা তৈরি করছে। কারণ, জেলে পরিবারের গৃহবধূরাই জাটকা সংরক্ষণসহ বড় ইলিশ উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।