আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

কালাই উপজেলা যেনো কিডনি কেনা-বেচার অভয়ারণ্য

news-image

নাম মো.মোশারফ হোসেন। জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের বহুতি গ্রামের বাসিন্দা তিনি। ২০১১ সালের শুরুতে দালালদের খপ্পরে পড়ে ৪ লাখ টাকায় নিজের কিডনি বিক্রি করার চুক্তি করেন তিনি। ঢাকার একটি কিডনি প্রতিস্থাপনের কাজ শেষ হওয়ার পর তাকে দুই লাখ টাকা দেওয়া হলেও বাকি টাকা আর দেওয়া হয়নি।

নিজের কিডনি বিক্রি করে টাকা না পেয়ে ক্ষোভে তিনি নিজেই দালালদের খাতায় নাম ওঠান। বর্তমান তিনি কিডনি বেচা-কেনা করে অনেক সম্পত্তির মালিকও হয়েছেন। তাদের মত প্রতিদিন নতুন কিডনি বিক্রেতা এবং দালাল সৃষ্টি হচ্ছে এই এলাকায়। তার মত অল্প সময়ে যারা কিডনি বেচা-কেনার নতুন দালাল বনে গেছেন তারা হলেন, উপজেলার বিনইল গ্রামের মো. কাওছার, বাগইল গ্রামের জুয়েল, কুসুমসারা গ্রামের আশরাফ আলী, দূর্গাপুর গ্রামের ছাইদুর রহমান, নয়াপাড়া গ্রামের নুরনবী, বাগইল গ্রামের ইমরান হোসেন, তালোড়া বাইগুনি গ্রামের আলামিনসহ অনেকেই। এদের অধিকাংশই ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট শহরে রিক্সা চালকের কাজ করেন।

কালাই উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে দৈনিক ইত্তেফাক-এর অনুসন্ধান রিপোর্টে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠে। এ অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে, অন্তত ৪০টি গ্রামে কিডনি কেনাবেচার শক্ত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন ঢাকার মহাজনদের হয়ে স্থানীয় দালালেরা। এর সামনে, গত কয়েক বছর ধরে উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের-উদয়পুর, মোসলিমঞ্জন, মোহাইল, থল, বাগইল, জয়পুর-বহুতি, নওয়ানা, টাকাহুত, নয়াপাড়া, বহুতি, দুর্গাপুর, বহুতি-গুচ্ছগ্রাম, উত্তর-তেলিহার, ফুল-পুকুরিয়া, তেলিহার, ভুষা, শিমরাইল বা কাশীপুর, পাইকপাড়া, বিনইল ও পূর্বকৃষ্টপুর। আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের-রাঘবপুর, বৈরাগী-পাড়া ও বোড়াই। মাত্রাই ইউনিয়নের- মাত্রাই উত্তরপাড়া, শালগুন, উনিহার, সাতার, কুসুমসাড়া, পাইকশ্বর, ভেরেন্ডি, উলিপুর, ইন্দাহার, অনিহার, ভাউজাপাতার, শিবসমুদ্র, পাইকশ্বর, ইন্দাহার, ছত্রগ্রাম এবং কালাই পৌর এলাকার থুপসাড়া ও কাতাইল মহল্লায়।
এই মহামারি করোনাকালীন সময়ও থেমে ছিলনা ওদের কিডনি বেচা-কেনার কারবার। প্রতিনিয়ত এ উপজেলার অভাবী মানুষদের দেহের মূল্যবান কিডনি বিক্রিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন এসব দালালরা। নতুন নতুন দালালদের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে গ্রামের অভাবী মানুষেরা কিডনি বিক্রির জন্য রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন দেশে গিয়ে কিডনি বিক্রি করছেন। কিডনি বিক্রি এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও অভাবী মানুষেরা কয়েক বছর ধরে কিডনি বিক্রির মতো আত্মঘাতী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন এ উপজেলায়। কিডনি বিক্রি করে সামান্য নগদ অর্থ হাতে পেলেও দালাল চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের অর্থ। কিডনি বিক্রেতারা দেশে ফিরে টাকা না পেয়ে ক্ষোভে নতুন করে দালালদের খাতায় নাম যোগ করছেন। প্রতিনিয়ত এ এলাকায় নতুন করে কিডনি বিক্রেতা এবং দালাল বেড়েই চলেছে। এমনকি এই ব্যবসা বাবার পরে ছেলেও ধরছেন।

এলাকার সহজ-সরল, অভাবী ও খেটে খাওয়া মানুষগুলো দালালদের চটকদার কথার খপ্পরে পড়ে গোপনে তাদের কিডনি বিক্রি করেন এবং বিক্রির পর মূল টাকা না পেয়ে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হন। দালালদের লোভনীয় অফার, মোটা অংকের টাকার লোভে কিছুটা সংসারের সচ্ছলতার স্বপ্ন দেখে এক সময় তারা শরীরের মূল্যবান অঙ্গ বিক্রি করলেও এখন অর্থের অভাবে হচ্ছেনা তাদের চিকিৎসা। ফলে কিডনি বিক্রেতারা কোনো উপার্জন মূলক কাজ করতে না পারায় তাদের গোটা পরিবার এখন মানবেতর জীবন যাপন করছে।

এদিকে দালালদের বিভিন্ন সময় আটক করে জেল-হাজতে পাঠানো হলেও জামিনে বের হয়ে আবারও নতুন উদ্যোগে নেমে পড়েন কিডনি সংগ্রহে। তবে মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-১৯৯৯ এর ৯ ধারায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই আইনের ১০(১)/১০(২) ধারা অনুযায়ী কেউ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিক্রি বা ক্রয় কিংবা সহায়তা করিলে সর্বনিম্ন ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। শাস্তির বিধান অক্ষুণ্ণ রেখে ২০০৯ সালে মোবাইল কোর্ট আইনেও এটি সংযোজন করা হয়েছে। যদিও আইনের তোয়াক্কা না করে যে যার মত করে উপজেলায় নিজের দেহের মূল্যবান সম্পদ কিডনি বিক্রি করেই চলছেন। শুধু কিডনিই নয়, এমনকি কলিজাও বিক্রি করেছেন।

সম্প্রতি কিডনি বিক্রেতা বহুতি গ্রামের সাজেদা বেগম বলেন, ‘চলতি বছর জুলাই মাসে এলাকার দালাল মোস্তফার সঙ্গে ঢাকায় যাই। পরে সাড়ে তিন লাখ টাকাতে কিডনি দিতে রাজি হই। ইন্ডিয়াতে গিয়ে ঢাকার এক স্থানীয় চাকুরীজীবীর বোনকে কিডনি দেই। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে বাড়ীতে আসছি। এখন কোনো কাজকাম করতে পারছিনা। ভয়ে ডাক্তারের কাছেও যেতে পারছিনা।’

উপজেলার বৈরাগীহাটের চৌমুহনী বাজারের পল্লী চিকিৎসক আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০০৯ সালের শুরু থেকে ২০১৯ সালের শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের নজরদারীতে কিডনি বেচাকেনা মোটামুটি বন্ধ ছিল। কেন যেন নতুন করে আবারও অনেক অভাবী নারী-পুরুষরা কিডনি বিক্রি করছেন। দালালদের মাধ্যমে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে কিডনি বিক্রির ভয়ংকর তৎপরতা। কিডনি বিক্রি করে বাড়ীতে ফেরার পর তাঁরা নিজেরাই দালাল হয়ে যাচ্ছেন। এ এলাকার অনেকের শরীর পরীক্ষা করলে একটি করে কিডনি খুঁজে পাওয়া যাবে।

উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো.ওয়াজেদ আলী বলেন, গত কয়েক বছর থেকে উপজেলার প্রায় ৪০টি গ্রামের অভাবী মানুষেরা গোপনে তিন শতাধিক কিডনি বিক্রি করেছেন। তবে এদের অধিকাংশের স্বাস্থ্যের অবস্থা বর্তমান খুব খারাপ।

কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেলিম মালিক বলেন, প্রচলিত ফৌজদারি আইনে মানব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেনাবেচা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিডনি বিক্রি বন্ধে যা যা করা দরকার সবই করা হচ্ছে। দালাল ও বিক্রেতাদের গ্রেফতার অব্যাহত রাখা হয়েছে। এ পর্যন্ত কিডনি সংক্রান্ত কালাই থানায় ৬টি মামলা দায়ের হয়েছে। গত সোমবার দুধাইল গ্রামের কিডনি বিক্রেতা সুজাউল মণ্ডল বাদী হয়ে ৫ দালালকে আসামী করে মামলা দায়ের করেছেন। মামলা দায়ের পর র‌্যাব সদস্যরা তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিডনি বেচাকেনার সাথে জড়িত ৫ জন দালালকে কালাই ও ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে কালাই থানায় সোপর্দ করেছে। বুধবার দুপুরে তাদের জেল-হাজতে পাঠানো হয়েছে।

কালাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মিনফুজুর রহমান মিলন বলেন, এই উপজেলার মানুষগুলো কিডনি বিক্রির ভয়ংকর পেশায় ঝুঁকছেন। নিজের ভালোটাও বুঝতে চাইছেন না অনেকেই। দালালদের খপ্পরে পড়ে স্বেচ্ছায় অঙ্গহানি ঘটিয়ে তাঁরা বাড়ি ফিরছে। অভাবের কারণে আত্মঘাতী পথ বেছে নিলেও মুক্তি মিলছেনা তাদের। উল্টো অল্প বয়সে অসুস্থ আর কর্মহীন হয়ে পড়ছে এসব মানুষেরা। প্রশাসনের সাথে আলাপ করে এদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

এ জাতীয় আরও খবর