আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

কেমিক্যাল বর্জ্যে বেলকুচির নলকূপের পানি ব্যবহারের অযোগ্য

news-image

প্রতিনিধি,সিরাজগঞ্জ:
সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প সমৃদ্ধ উপজেলা গুলোতে স্থানীয় তাঁত শিল্পের কাঁচামাল সুতা,রঙসহ বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক বর্জ্য মিশ্রিত দূষিত পানি প্রতিনিয়ত ফেলা হচ্ছে ছোট নদী ও খাল বিলে । এ পানি আবার যাচ্ছে নলকুপ গুলোতে । অনেক স্থানেই স্থনীয় প্রভাবশালিরা বিদ্যুৎ চালিত পাম্পের সাহায্যে এসব বর্জ্য মিশ্রিত পানি মাটির নিচে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরেও মিশিয়ে দিচ্ছে । ফলে নলকুপের পানিতে সাবানের মত ফেনা হচ্ছে যা কি না পানকরবার অনুপোযোগী হলেও বাধ্য হয়ে তা পান করছে মানুষ । একটু বাতাসেই দুর্গন্ধে মৌ মৌ করছে বিশাল এলাকা । তাই এ অবস্থা হতে পরিত্রাণের জন্য সরকারের সহায়তা চাইলেন এলাকাবাসী ।
বেলকুচি প্রসেসমিল মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, শুধুমাত্র বেলকুচিতেই সূতা প্রসেস কারখানা রয়েছে সমিতি ভুক্ত ১৩ টি ।এর বাইরে ফিরুজা রঙের কারখানা,তাঁতীদের বাড়িতে সূতা রঙের ডাইং কারখানাসহ বিচ্ছিন্ন ভাবে আরও বেশ কিছু এই ধরনের সূতা রঙে ক্যামিক্যাল ব্যবহৃত কারখানা রয়েছে ।এছাড়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ১৫০ টির মত রয়েছে সূতা প্রক্রিয়া করন কারখানা, ২হাজারের মত রয়েছে ডাইং ও প্রায় ২০ টির মত রয়েছে ফিরুজা বঙের কারখানা ।
গত রোববার সকালে সরেজমিনে জেলার বেলকুচিতে তামাই গ্রামের নতুন পাড়া গিয়ে দেখা যায় এলাকাটিতে এখন আর কেও নলকুপের পানি পান করতে পারছেন না । যে কারনে নলের নাহায্যে অনেক দুর হতে পানি টেনে তাদের পান করতে হচ্ছে ।আবার অনেক স্বচ্ছল পরিবার শহরের মানুষের মত বোতল জাত পানি কিনে পানকরছেন । বর্তমানে এই এলাকাটির ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে এই বর্জ্য মিশ্রিত দুষিত পানি ছড়িয়ে পড়ায় অনেক দুরের পানিও খাবারের অযোগ্য হচ্ছে এমনটি জানালেন এলাকাবাসী ।
বর্তমান অবস্থা:
নাম প্রকাশ না করবার শর্তে স্থানীয় এক বিদ্যুৎ মিস্ত্রী(ইসমাইল হোসেন) জানান,তামাই গ্রামের মুন্সী ব্রাদার্স প্রসেস কারখানার ক্যামিক্যাল মিশ্রিত বর্জ্য পানি এখন গোপনে ঘরের মধ্যে বিদ্যুৎ চালিত পাম্প বসিয়ে সেই পাম্পের সাহায্যে দেওয়া হচ্ছে মাটির নিচে ।যা কিনা তিনি ওই প্রসেস কারখানটিতে বিদ্যুতের কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন বলে নিশ্চিত করেছেন ।তিনি জানান নাম প্রকাশ করতে তেনার কোন সমস্যা নেই তবে কারখানা মালিক গণ প্রভাবশালী হবার কারনেই তার এমন আপত্বি।এমন অনেক কারখানা থেকেই মাটির নিচে বর্জ্য মিশ্রিত পানি দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি ।
তামাই গ্রামের ফিরোজ আহমেদ জানান,কতটা দিন হলো আমার একটু শান্তিতে পানি খাইতে পারিনা।নলকুপের পানিতে ফেনা ওঠে ।এই পানি খাওয়াতো দুরের কথা গোসল করলেও সমস্যা ।একটু বৃষ্টি হলে এই প্রসেস কারখানার পানির দুর্গন্ধে এলাকায় থাকা যায় না ।এসব কারখানা মালিকদের বলে কোন লাভ হয় না।
গোলাম ছারোয়ার বলেন,আমরা বারবার সমস্যার কথা বলায় কারখানা মালিকরা কিছু এলাকায় নলের সাহায্যে পানি টেনে সরবরাহ করছে । এখন সে পানিও পান করবার অনপযোগী হয়েছে ।পানি কিছুক্ষন পাত্রে রাখলে নিচে ধাতপ পদার্থের মত কি যেন জমাট বাঁধে ।
সেরাজুল ইসলাম জানান,এই প্রসেস কারখানায় ব্যবহৃত ক্যামিক্যালের কারনে আমাদের ঘরে টিনের চালা প্রতি বছর বছর পালটাতে হয় ।একটু বৃষ্টি হলে টিন লাল হয়ে ছিদ্র হয়ে সেখান দিয়েঝর ঝর করে পানি পানি পরে ।বাড়িতে নলকুপ থাকলেও সেখান থেকে পানি খাবার উপায় নেই ।
অনেক আক্ষেপ করে একই গ্রামের বাবুল খান বলেন,আপনাদের কাছে দুঃখের কথা বলে কী লাভ ।কারখানা মালিকদের অনেক টাকা তার টাকা দিয়ে সবার মুখ বন্ধ রাখে আমরা যে কী কষ্টে আছি সেটি বলে বুঝাতে পারবো না । মুন্সী ব্রাদার্স প্রসেস কারখানার বর্জ্য মিশ্রিত পানি এখন মাটির নিচে দেওয়া হচ্ছে।যে কারনে অনেক দুর থেকে টেনে আনা নলকুপের পানি খেয়ে শিশুরা মাঝে মধ্যেই অসুস্থ হচ্ছে ।
তৃতীয় শ্রেনীতে পড়–য়া ছোট শিশু আয়শা খাতুন বলেন,আমারা এই পানি খাইতে পারিনা ।একটু খেলে পেট ব্যথা করে ।
এই এলাকায় নলকুপ গুলো চেপে দেখা যায় পানিতে এক প্রকার ফেনার সৃষ্টি হচ্ছে।এই পানি খাবারের জন্য তো দুরের কথা গোসলের ও অযোগ্য বলে দাবি করছেন তামাই আল্ অমিন তাঁত কার খানায় কর্মরত কুড়িগ্রাম থেকে আসা শ্রমিক ইউসুফ আলী ।
তিনি তার শরীর দেখিয়ে বলেন দুই দিন এই পানিতে গোসল করে শরীরে ছোট ছোট গোটার মত কী যেন উঠেছে ।
প্রতিকার :
এই অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করছে । দীর্ঘদিনের সমস্যাটি সমাধানে সরকারের সহায়তা চাইলেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও ।
সিরাজগঞ্জ স্বার্থরক্ষা সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক জহুরুল হক জানান, সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে এই শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করতে হবে । দেশের তাঁত শিল্প একটি সম্ভাবনাময় শিল্প । এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে এখনই সময় এসেছে পরিকল্পা করবার। এক্ষেত্রে গুরুত্ব সহকারে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরকে এগিয়ে আসতে হবে ।
মুন্সী ব্রাদার্স প্রসেস কারখানার স্বত্বাধীকারী শওকত মুন্সি জানান,আমরা বর্জ্য মাটির নিচে দেই না । নিজেস্ব খালের মধ্যেফেলি । আসলে এমন ভাবেও বর্জ্য ফেলতে চাই না । বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারের পক্ষ হতে উদ্যোগ নেওয়া হলে আমরাও সহায়তা করবো ।
বেলকুচি প্রসেসমিল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মজিদ জানান, সব প্রসেস কারখানাকে একত্রিত করে একই অঞ্চলে নিয়ে একটি বর্জ্য প্রক্রিয়া করন প্লান্ট তৈরীর প্রস্তাবনা আমরা জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে সরকারকে দিয়েছি।এটি হলে এই সমস্যার সমাধাণ হবে ।
বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনিসুুর রহমান জানান,যেহেতু তাঁতশিল্প সমৃদ্ধ এলাকা সেহেতু সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না হলে এমন অবস্থার সৃষ্টি হতেই পারে । দ্রæত সময়ের মধ্যে মাঠে গিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক(রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয় বগুড়া)আশরাফুজ্জামান প্রথম আলোকে জানান,আমাদের জন বল কম ।যে কারনে ইচ্ছে থাকলেও যথাযথ ভাবে ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারিনা ।কোন এলাকায় ব্যবস্থা গ্রহন করতে চাইলে সেই জেলার জেলা প্রশাসককে আমরা অবগত করি।তেনারা সেটির ব্যবস্থা গ্রহন করেন ।এই বিষয়েও আমরা জেলা প্রশাসককে অবগত করবো ।