আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

জ্বালাও পোড়াও চলবে না ॥ হেফাজতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ,নাশকতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ আইন অমান্য করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না

news-image

হেফাজতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে সরকার। সারাদেশে তাদের নাশকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টিসহ একের পর এক হুংকার, সরকারী অফিস ভাংচুর, জ্বালাও পোড়াও রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়। বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে দেশের বিভিন্ন ডিসি-এসপিকে টেলিফোনে এই নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, হেফাজতে ইসলাম একের পর এক সরকারী অফিস ভাংচুর করছে। বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ঘটিয়ে রীতিমতো তা-ব চালিয়েছে। এছাড়া তারা পুলিশ ও থানার ওপর হামলা চালাবে বলেও হুমকি দিচ্ছে। এটি কোন অবস্থায় বরদাস্ত করা হবে না। শুধু তাই না, এরা সরকারের জমি দখল করে মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করে রেখেছে। পর্যায়ক্রমে এদের সরকারী জমি থেকে উচ্ছেদ করা হবে। সকলকে আইন মানতে হবে। যত ক্ষমতাশালী হোক না কেন আইন অমান্য করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের উর্ধতন এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, হেফাজত ইসলাম অনেক বাড়াবাড়ি করছে। ২০০১ সালের সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপর যে কায়দায় হামলা চালানো হয়েছিল, এখনও সেই কায়দায় হামলা করতে চায় তারা। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ওই সময় ক্ষমতার পালাবদলের মধ্যে ঘটনা ঘটিয়েছিল। তখন মূলত দেশে কোন সরকার ছিল না। এখন তো সরকার আছে। এখন যা খুশি তাই করা চলবে না।

সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে হেফাজত হরতালের নামে নাশকতা, নৈরাজ্য ও সহিংসতার সৃষ্টি, পুলিশ ফাঁড়ি ও বক্সে আগুন, পুলিশের ওপর হামলাসহ পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। হেফাজতে ইসলামকে সামনে দেখা গেলেও তাদের পেছনে মদদদান করছে বিএনপি, জামায়াত শিবির। বিএনপি-জামায়াতের সেই পুরনো ভারতবিরোধিতার রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি করে সরকারের পতন ঘটানোর নীল নক্সা করে মাঠে নামানো হয়েছে হেফাজতে ইসলামকে। এই ধরনের কর্মকা-ের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর অবস্থানে থাকার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলাম হরতাল ডেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে তা-ব চালায়। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টানা তৃতীয় দিনের মতো তা-ব চালিয়েছে মাদ্রাসাছাত্ররা। তখন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী স্থাপনায় হামলা চালিয়ে আগুন দেয় তারা। এ ছাড়া জেলার সরাইলেও হামলা-ভাংচুর চালান হেফাজতের কর্মীরা। তাদের সঙ্গে পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া রাজধানীর উপকণ্ঠ নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক তা-ব চালায় তারা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর ঘিরে শুক্রবার (২৩ মার্চ) থেকে হেফাজতে ইসলাম তা-ব চালানো শুরু করে। শুক্রবার ঢাকায় বিক্ষোভের সময় সংঘাতের ঘটনার প্রতিবাদে ওই দিন বিকেলে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে হামলা-ভাংচুর চালায় হাটহাজারী মাদ্রাসার ছাত্ররা। সেখানে সংঘর্ষের ঘটনায় হাতহাতের ঘটনা ঘটে। এর প্রতিবাদ জানাতে ওই দিন বিকেলেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রাস্তায় নামেন হেফাজতের কর্মীরা। তারা রেলস্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং শহরে ব্যাপক তা-ব চালায়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয় একজন। হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনার প্রতিবাদে হরতাল ডাকে হেফাজত। এর আগে শনিবার বিক্ষোভ কর্মসূচী পালনকালে ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা ও ভাংচুর চালায় সংগঠনের কর্মীরা।

হেফাজত নেতাকর্মীরা ওইদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জেলা পরিষদ কার্যালয়, পৌরসভা কার্যালয়, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন, প্রেসক্লাব, পৌর মিলনায়তন, সদর উপজেলা ভূমি অফিস, পুলিশ লাইন, সদর থানা, খাঁটিহাতা বিশ্বরোড হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি, শ্রী শ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়ি, দক্ষিণ কালীবাড়ি, রেলওয়ে স্টেশন, জেলা আওয়ামী লীগ ও সংসদ সদস্যের কার্যালয়, সরকারী গণগ্রন্থাগার, গ্যাস ফিল্ড কার্যালয়, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল-মামুন সরকারের কার্যালয়, তার নিজের ও শ্বশুরবাড়ি, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি পাঠাগার, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা চত্বরে আয়োজিত উন্নয়ন মেলার অর্ধশত স্টল, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবন, প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা চৌধুরী আফজাল হোসেন নেসারের বাড়ি, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আনার, জামাল খানের বাড়ি, বিজয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোঃ জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়ার কার্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে।

এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন, আশুগঞ্জ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুর টোল প্লাজার পুলিশ ফাঁড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং সরাইলের খাঁটিহাতা বিশ্বরোড হাইওয়ে থানায় হামলা চালায় হরতাল সমর্থনকারীরা। টোল আদায়ের বুথ ভাংচুর করা হয়। খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার ওসি গাজী শাখাওয়াত হোসেন জানান, হঠাৎ করে থানায় হামলা হয়। হেফাজতের কর্মীদের হাতে সাধারণ লাঠিসোটা দেখা গেলেও ওইদিন জিন্স প্যান্ট ও টি-শার্ট পরা অনেক যুবককে দা, হকস্টিকের মতো দেশীয় অস্ত্র হাতে দেখা গেছে।

হরতালকারীরা নালার কংক্রিটের স্ল্যাব তুলে এনে রেললাইন অবরোধ করায় ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। স্টেশনের কাছের রেলগেটের ব্যারিয়ার বাঁকা করে ফেলা হয়। রেললাইন থেকে ক্লিপ খুলে ফেলা হয়। তালশহর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনের মাঝখানে একটি সেতুতেও আগুন দেয়া হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের কাঁচ ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। প্রেস ক্লাবের সভাপতি দৈনিক জনকণ্ঠের স্টাফ রিপোর্টার রিয়াজউদ্দিন জামির ওপর হামলা করা হয়।

রেলওয়ে স্টেশন সূত্র জানায়, ওইদিন ঢাকা-চট্টগ্রাম পথের বিরতিহীন সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে পৌঁছলে ইটপাটকেল ছোড়ে তারা। এতে ট্রেনের ইঞ্জিন ও কোচের কাঁচ ভাংচুর হয়। ট্রেনটি ফিরিয়ে ভৈরবে নিয়ে আসা হয়। এর আগে সিলেটগামী পারাবত ও একটি মালবাহী ট্রেন বিরতি ছাড়া স্টেশনের ওপর দিয়ে যায়। সোনার বাংলা ট্রেনে হামলা হলে সব ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, যে কারণে চট্টগ্রাম অভিমুখী মহানগর এক্সপ্রেস নরসিংদী, ঢাকাগামী সুবর্ণ এক্সপ্রেস কসবা, কালনী এক্সপ্রেস আজমপুর, বিজয় এক্সপ্রেস কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া অভিমুখী তিতাস কমিউটার নরসিংদীর জিনারদী স্টেশনে আটকা পড়ে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে মাদ্রাসার ছাত্রদের রাস্তায় নামিয়ে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেটসহ দেশের বিভিন্নস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা, ইটপাটকেল নিক্ষেপ, যাত্রীবাহী বাসে আগুন, ভাংচুর, রাস্তা অবরোধ, রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টিসহ সন্ত্রাসের তা-বলীলা চালায় হেফাজতে ইসলাম। কোন মহল যেন নাশকতার জন্য জমায়েত না হতে পারে সেজন্য পুলিশকে কঠোর অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে। এছাড়া পুলিশের সব থানা এবং সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তার নিরাপত্তা জোরদারেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র বলছে, সাধারণ বিক্ষোভকে সহিংসতায় রূপ দিতে নেপথ্যে কাজ করেছে জামায়াত-বিএনপির পেইড এজেন্টগুলো। এ ছাড়া সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদ যে সহিংসতা করেছে তার মধ্যে শিবিরের একটা বড় অংশগ্রহণ ছিল। আর এর একটা বড় অংশ রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকায় এসেছে সহিংসতা করার জন্য। এ ছাড়া লন্ডনে অবস্থানরত তারেক জিয়া আগে থেকেই দেশবিরোধী ভূমিকায় ছিল আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জামায়াতের অর্থদাতারা এবং এর সঙ্গে ছাত্রদের উস্কে দিতে কাজ করছেন ডাকসুর সাবেক ভিপি নূর। যদিও কিছুদিন ধরেই হেফাজত নেতা মানুনুল হক উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে সহিংসতা ছড়াচ্ছে। কিন্তু সরকারের কঠোর অবস্থান এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতার কারণে বড় ধরনের সহিংসতা থেকে রক্ষা হয়েছে। এ ছাড়া নরেন্দ্র মোদির গোপালগঞ্জ ও সাতক্ষীরা সফরকে কেন্দ্র করে সারাদেশে বিজিবিসহ কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে ফলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে বলেও জানানো হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, হেফাজতের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে সরকার। বাবুনগরী ছিল ২০১৩ সালে ঢাকায় সন্ত্রাসের তা-বলীলা চালানোর অন্যতম হোতা। এজন্য তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছিল। তাকে জেলেও যেতে হয়েছিল। কিন্তু তারপর সরকার হেফাজতের সঙ্গে একটি আপোস সমঝোতার পথ বেছে নেয়। এই সমঝোতার ফলে বাবুনগরীর বিরুদ্ধে মামলাগুলো আর সচল থাকেনি। তবে বাবুনগরীর সঙ্গে যে বিএনপি এবং জামাতসহ প্রতিক্রিয়শীল রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সম্পর্ক রয়েছে সেই বিষয়টি আর গোপন নেই। বাবুনগরী দায়িত্ব গ্রহণের পরে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে বিরোধিতা করে দেশে উত্তেজনার সৃষ্টি করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করেছে। বাবুনগরীসহ তিন জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়েছে যা তদন্তাধীন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকে সামনে রেখে যেভাবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশে হরতাল, নাশকতা, নৈরাজ্য, অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলাসহ সন্ত্রাসের তা-বলীলা চালানোর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে তা কঠোর হস্তে দমন করা হবে। এর আগে হেফাজতের তরফ থেকে তারা বলেছে নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতা তারা করবে কিন্তু কোন ধরনের সহিংস কর্মসূচীতে যাবে না বলে সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয়। এরপর হেফাজত এখন যা করছে তা পূর্বপরিকল্পিত নীল নক্সা অনুযায়ী। এই নীল নক্সা প্রস্তুতকারকরা দেশে-বিদেশের চিহ্নিত অপশক্তি এবং এই অপশক্তি দমনে কঠোর অবস্থান নিবে সরকার।