আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

টাকা নিয়ে বিদেশফেরতদের ছেড়ে দিচ্ছে কোয়ারেন্টিনের হোটেলগুলো

news-image

করোনার ভ্যাকসিন না নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ১২টি দেশ থেকে বাংলাদেশে এলে হোটেলে ১৪ দিনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। তবে এ নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্রেফ টাকা নিয়ে যাত্রীদের ছেড়ে দিচ্ছে কোয়ারেন্টিনের জন্য সরকার-নির্ধারিত বেশিরভাগ হোটেল। কোনও হোটেল আবার বিমানবন্দর থেকেই বিদেশফেরতদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছে। হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে ১৪ দিন হোটেল থাকার ভুয়া বিল। নজরদারি না থাকায় বেশিরভাগ হোটেলেই চলছে এমনটা।

দেশে করোনা সংক্রমণ রোধে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। যা ৫ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। বিদেশফেরতদের কোয়ারেন্টিনের জন্য ৯৩টি হোটেলকে দেওয়া হয়েছে অনুমোদন।

‘হোটেলের গেস্ট সবাই বাড়িতে’
অনুসন্ধানে দেখা গেলো- রাজধানীর উত্তরার ১১ নং সেক্টরের গ্র্যান্ড লেক ভিউ হোটেলটিতে একদিনও কোয়ারেন্টিনে থাকা লাগে না বিদেশফেরতদের। যাত্রীদের বিমনবন্দর থেকেই বাড়িতে যাওয়ার ‘ব্যবস্থা’ রেখেছে হোটেলটি।

যাত্রীর স্বজন পরিচয়ে হোটেলটির রিজারভেশনে ফোন (01704-78..04) করলে এ প্রতিবেদককে তারা জানায়, ১৪ দিনের জন্য হোটেলে বুক করলেই একটা ‘ব্যবস্থা’ করে দেওয়া যাবে।

গ্র্যান্ড লেক ভিউ হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কে পাওয়া গেলো মনির হোসেন নামের একজনকে। তিনি বললেন, ‘২১ হাজার টাকা দিয়ে বুকিং দিন, সব ব্যবস্থা করে দেবো।’

আরও বললেন, ‘আপনার যাত্রীকে আমরা ১৪ দিনের হোটেল বুকিংয়ের ডকুমেন্ট বানিয়ে দেবো। সেটা বিমানবন্দরে দেখালে কেউ সন্দেহ করবে না। বিমানবন্দরে থেকেই যাত্রী নিয়ে চলে যেতে পারবেন। আমাদের হোটেলে এখন কোনও গেস্ট নেই, সবাই বাড়িতে।’

বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ থেকে নামার পর যাত্রীদের হেলথ স্ক্রিনিংয়ের পাশাপাশি করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট, হোটেল বুকিংয়ের কাগজপত্র, ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট ইত্যাদি চেক করা হয়। যাদের কোয়ারেন্টিন লাগবে না, তাদের এক গেট, যাদের লাগবে তাদের আলাদা গেট দিয়ে বের হতে হয়।

কোয়ারেন্টিন যাত্রীদের পৃথক করার কঠোর ব্যবস্থা না থাকাতেও অনেকে সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে মিশে বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন। ‘বিমানবন্দর ফাঁকি দিয়ে কোয়ারেন্টিনের ৬ যাত্রী বাড়িতে’ শিরোনামে বাংলা ট্রিবিউনে প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়।

উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরে সিটি হোমস। ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনের জন্য ২৫ হাজার টাকা নিচ্ছে হোটেলটি। তাদের রিজারভেশনে (01711-93..74) ফোন করলে জানানো হলো, ২৫ হাজার টাকা বুকিং দিয়ে হোটেলে আসতে হবে। ২-৩ দিন পর ম্যানেজ করে বাড়িতে যাওয়ার ‍সুযোগ করে দেওয়া হবে।

নিজেকে সিটি হোমসের চেয়ারম্যান দাবি করলেও নাম বলেননি ফোনের অপরপ্রান্তে থাকা ব্যক্তিটি।

বিদেশফেরত এক যাত্রীর স্বজন নূর উদ্দীন ‍ভূইয়া বলেন, ‘আমার পরিচিত একজন জুনে বিদেশ থেকে আসে। তখন তাদের তিনদিন কোয়ারেন্টিনে থাকার কথা ছিল। দ্য ডেইজ হোটেল বুক করে ঢাকায় আসে তারা। হোটেলে যাওয়ার পর করোনার টেস্ট করাতে তাদের কাছ থেকে আড়াই হাজার টাকা নিয়ে বলা হয় আপনারা বাড়িতে চলে যান, হোটেলে থাকা লাগবে না।’

উত্তরার ১ নম্বর সেক্টরের ব্লু ক্যাসেল হোটেলে দুদিন থাকার পর এক বিদেশফেরত ব্যক্তিকে বাড়িতে যাওয়ার সব ব্যবস্থা করে দেয় হোটেল কর্তৃপক্ষ। হোটেলটির রিজারভেশনের মো. সিরাজ বলেন, ‘১২ হাজার টাকা দিয়ে বুকিং করেন। তারপর বাকি দায়িত্ব আমাদের। দুই দিন থেকে চলে যেতে পারবেন।’

পাসপোর্ট কৌশল
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক হোটেল যাত্রীদের বাড়ি পাঠাতে বেশ কৌশলী। তারা যাত্রীর পাসপোর্ট হোটেলেই রেখে দেয়। যাতে কোনও সংস্থা অভিযান চালালে তারা পাসপোর্ট দেখিয়ে বলতে পারে, এ যাত্রী হোটেলেই আছেন। মূলত যাত্রী পাসপোর্ট রেখেই চলে যান বাড়িতে। চুক্তি হয়-১৪ দিন পর এসে পাসপোর্ট নিয়ে যাবেন কিংবা তাকে কুরিয়ার করে সেটা পাঠিয়ে দেবে হোটেল কর্তৃপক্ষ।
বেবিচকের নিয়ম অনুসারে, ১২টি দেশ থেকে ফিরে এলে ১৪ দিন সরকার নির্ধারিত হোটেলে নিজখরচে কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। ফ্লাইটে ওঠার আগেই হোটেল বুকিং করতে হবে। দেশগুলো হলো- আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, কোস্টারিকা, জর্জিয়া, কুয়েত, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, উরুগুয়ে। তবে কেউ যদি করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে আসেন, তবে কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে না। তিনি বাড়িতে গিয়ে ১৪ দিন আইসোলেশনে থাকবেন।

আগের গেস্ট কোথায় যায়?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হোটেল কর্মকর্তা বলেন, ‘একটি হোটেলের সক্ষমতা ৫০ জনের। দুই-তিন দিনে ৫০ জন কোয়ারেন্টিনের ব্যক্তি হোটেল নিয়েছে। সেক্ষেত্রে আগামী ১০-১২ দিনের মধ্যে তো নতুন কাউকে রাখার জায়গা থাকার কথা নয়। অথচ হোটেলটি প্রতিদিনই গেস্ট নিয়ে আসছে। তা হলে আগের ব্যক্তিরা কোথায় যায়? বিমানবন্দরে কোয়ারেন্টিনের বিষয় যাদের দেখার কথা, তারা এগুলো খেয়াল করেন না। যারা কোয়ারেন্টিন যাত্রীদের বাড়ি যাওয়ার সুযোগ করে দেয়, তাদের অতিথির অভাব নেই। আর আমরা যারা সরকারের নির্দেশনা শতভাগ মেনে চলি আমাদের সপ্তাহে সাতজনও গেস্ট পেতেও কষ্ট হয়।’

তিনি আরও জানান, ‘আগে ১৪ দিনে ৩৫-৪০ হাজারের নিচে কোনও প্যাকজ ছিল না। এখন ১২ হাজারেও অনেক হোটেল প্যাকেজ দিচ্ছে। এটা হোটেলে থাকার প্যাকেজ নাকি বাড়ি যেতে দেওয়ার প্যাকেজ তা দেখার কেউ নেই।’

স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি নেই
১১ জুলাই দুবাই থেকে এসেছিলেন দুজন। তারা কোয়ারেন্টিনের জন্য ওঠেন উত্তরার মনসুন ইন হোটেলে। কয়েক ঘণ্টা পরই তারা সিলেট যেতে হাজির হন বিমানবন্দরে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের টিকিট দেখালেই ধরা পড়েন তারা। পরে দুই যাত্রীকে বিমানবন্দরের ভ্রাম্যমাণ আদালাতে হাজির করা হলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আলী আফরোজ দুজনকে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করে আবার হোটেলে পাঠান। হোটেলটির এক প্রতিনিধিকেও থানায় সোপর্দ করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হোটেলটির চেয়ারম্যান ও জাতীয় পার্টির নেতা ইয়াহইয়া চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যাত্রীরা কোয়ারেন্টিনে থাকতে চায় না। আমরা তো কাউকে বেঁধে রাখতে পারবো না। আমরা যদি তাদের যেতে দিতাম, তা হলে বিমানবন্দরে পাঠাতাম না। তাদের পাসপোর্টও হোটেলে ছিল। যাত্রীদের কোয়ারেন্টিনে রাখা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা ২-৩ দিনের অ্যাডভান্স দেয়। তারপর বলে টাকা নেই, থাকবো না। এগুলো নিয়ে বিপদের মধ্যেই আছি। কর্তৃপক্ষকে জানালে বলে, বেঁধে রাখেন। এটা কি সম্ভব?’

এ ছাড়া, হোটেল অ্যাফোর্ড ইন, ব্লু ক্যাসেল, হোটেল মিলিনা, মেমেন্টো ইন্টারন্যাশনাল, স্কাই লিংক, লং বিচ, ব্লু বেরি, ক্যানারি পার্কসহ আরও বেশ কিছু হোটেলের বিরুদ্ধেও কোয়ারেন্টিনের নিয়ম না মানার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের সুপারিশের ভিত্তিতেই কোন দেশে থেকে আসলে কতদিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে তা নির্ধারণ হয়।

নিদের্শনায় বলা হয়েছে, কোয়ারেন্টিন পালন যথাযথ হচ্ছে কি-না, স্থানীয় প্রশাসন তা নিশ্চিত করবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, থানা থেকে দায়সারাভাবে মাঝে মাঝে কোনও হোটেলে যায় পুলিশ। তবে স্থানীয় প্রশাসনের কোনও নজরদারি নেই। স্বাস্থ্য অধিদফতরও মনিটিরিং করে না।

অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোয়ারেন্টিনের বিষয়টি নিশ্চিত করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ বিষয়ে আমাদের কাছেও অভিযোগ এসেছে। আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানিয়েছি। আমাদের লোকজন খোঁজখবর নিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কেবিনেটেও জানোনো হয়েছে।’