আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

থামছে না বুড়িগঙ্গা দখল বাধাগ্রস্ত মাস্টারপ্ল্যান

news-image

কোনোভাবেই দমন করা যাচ্ছে না বুড়িগঙ্গা নদী ও এর শাখা-উপশাখার জমি দখলবাজদের। একদিকে উচ্ছেদ হচ্ছে, আরেক দিকে নতুন নতুন জায়গা দখল হচ্ছে। নদীটির দক্ষিণ-পশ্চিমে শাখা-উপশাখার দুই তীর অনেকের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আর যারা দখল করছেন তারা এলাকার প্রভাবশালী। আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মী। তাদের ভয়ে প্রশাসনও অনেকটা তটস্থ থাকে। দখল করা জায়গায় গড়ে উঠেছে পার্ক, বহুতল ভবন, শিল্প কারখানা, বাজার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ নানা অবকাঠামো। পুরান ঢাকার লালবাগ-হাজারীবাগ এবং মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের কোলঘেঁষা বুড়িগঙ্গার শাখা নদীর বেশিরভাগ জায়গায়ই বেদখল হয়ে আছে। একসময় এই শাখা নদীতে পালতোলা নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার ও ইঞ্জিন বোটসহ বড় বড় নৌযান চলাচল করত। খরস্রোতা বুড়িগঙ্গার ঢেউয়ের শব্দ বহুদূর থেকে শোনা যেত। এখন আর তার কিছুই শোনা যায় না। প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অবৈধভাবে জমি দখল করে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার ছোট-বড় স্থায়ী-অস্থায়ী নানা স্থাপনা।

একদিকে যখন চলছে দখলের মহোউৎসব, অন্যদিকে তখন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সুপরিকল্পিতভাবে বুড়িগঙ্গার দখল হওয়া জায়গাগুলো উদ্ধার করে নদীর স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনার মাস্টারপ্ল্যান করছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। যদিও মাস্টারপ্ল্যানটি বাস্তবায়নের কাজ নানা কারণে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। এই মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী বুড়িগঙ্গার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে অবৈধভাবে জমি দখল করে গড়ে তোলা সব স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়ে নদী পুনঃখনন করা হবে। যার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে নদীর দুপাশের জমির সীমানাও চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী উদ্ধার করা জমিকে কাজে লাগাতে নদীর দুই পাড়কে নাগরিকদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে তৈরি করতে হাতিরঝিলের আদলে স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে আদি বুড়িগঙ্গাসহ রাজধানীর আশেপাশের সব নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রীসহ ঢাকার দুই মেয়রকে নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে সরকার। ইতিমধ্যেই একটি প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়েছে। বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল উদ্ধারের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (রাজউক) কর্র্তৃক সংশোধিত নতুন ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) এ সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কারিগরি ও কৌশলগত সব সহায়তারও আশ্বাস দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, প্রধানমন্ত্রী ও উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে বারবার নির্দেশের পরও বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলটি প্রতিনিয়তই দখল হচ্ছে। জলাধার সংরক্ষণ আইনের বিধি উপেক্ষা করে প্রায় তিন যুগ ধরে চলা দখলযজ্ঞে ইতিমধ্যেই চ্যানেলের শাখা নদীর প্রায় ৩৫০ একর জায়গা বেদখল হয়ে গেছে। আর এই দখল প্রক্রিয়ার কৌশল হিসেবে সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ও বালু ফেলে ভরাট করে নদীর বুক সংকুচিত করা হয়। পরে এসব জায়গায় গড়ে তোলা হয় শিল্পকারখানা, আবাসন প্রকল্প, পার্ক, রিকশা-ট্রাক স্ট্যান্ডসহ নানা স্থাপনা। এমনকি দখল পাকাপোক্ত করার জন্য দখল করা জায়গায় কৌশলে মসজিদও নির্মাণ করা হয়। এর আগে নদীর বুক দখল করে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ও নিচু করে গড়ে তোলা হয় কংক্রিটের কয়েকটি সেতু। যাতে এই নৌপথে ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচল করতে না পারে। এরপর নদীর বুক বালু ভরাট করে দখলের মহোৎসব চলে, যা এখনো চলছে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা তৈরি করে সাপ্তাহিক বা মাসিক হারে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে দখলবাজ চক্র। অবশ্য মাঝেমধ্যে জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল রক্ষায় নদীর দুই তীর দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান চালায়। কিন্তু অভিযানে স্থায়ী ব্যবস্থা না নেওয়ায় আবার দখলবাজদের কবলে চলে যায় বুড়িগঙ্গা।

সরেজমিনে ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাবুবাজার ব্রিজ থেকে গাবতলী পর্যন্ত রাজধানীর দক্ষিণ-পশ্চিমের বেড়িবাঁধের কোলঘেঁষে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ-পশ্চিমের শাখা নদীর লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ ও মোহাম্মদপুর অংশের বিস্তীর্ণ এলাকার প্রায় ২৪ হাজার ৫শ’ কাঠা (৩৫০ একর) জমি ইতিমধ্যে বেদখল হয়ে গেছে। লালবাগ-চকবাজারের বেড়িবাঁধসংলগ্ন কামালবাগ-আলীরঘাট, শহীদনগর, আমলীগোলা, কামরাঙ্গীরচরের মুসলিমবাগ ঠোঁটা থেকে বেড়িবাঁধঘেঁষা লোহারপুল, রহমতবাগ, ব্যাটারিঘাট, কুড়ারঘাট, পূর্ব রসুলপুর, নবাবগঞ্জ সেকশন, কোম্পানীঘাট পাকা ব্রিজঘেঁষা এলাকায় বালুমাটি আর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ফেলে নদী ভরাট করে দোকানপাট ও ট্রাক-লেগুনা স্ট্যান্ড গড়ে তোলা হয়েছে। লালবাগ বড় মসজিদ ঢাল ও পূর্ব রসুলপুর ২ নম্বর গলির সংযোগস্থল হাফেজ মুসা ব্রিজ, নবাবগঞ্জ সেকশন ও কামরাঙ্গীরচর রনি মার্কেটের সংযোগস্থলে নির্মিত পাকা ব্রিজঘেঁষা বিশাল এলাকা দখল করে মার্কেট ও বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। আমলীগোলা ঢালসংলগ্ন বেড়িবাঁধঘেঁষা বুড়িগঙ্গার বুকে ময়লা-আর্বজনা ফেলে স্তূপ করে সেখানে ট্রাকস্ট্যান্ড এবং পাশেই নদীর বুকে মাটি ফেলে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে নদীর বুক দখল করে ৫তলা পাকা দালান ও টিনশেড বাড়িঘর বানানো হয়েছে। নবাবগঞ্জ সেকশন ও কামরাঙ্গীরচর রনি মার্কেটের সংযোগস্থলের পাশে আদি চ্যানেলের বুকে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে বক্স কালভার্ট নির্মাণ করায় পশ্চিমে নদী দখলের মহোৎসব চলছেই। বক্স কালভার্টে বর্জ্য ফেলায় দখল-দূষণে বুড়িগঙ্গা এখানে মৃতপ্রায়। বুড়িগঙ্গার আদি এ চ্যানেলে রিকশার গ্যারেজ থেকে শুরু করে টেম্পোস্ট্যান্ড, অবৈধ মার্কেট, ট্রাকস্ট্যান্ড, বাড়িঘর, এমনকি মসজিদ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে। এছাড়া কোম্পানীঘাটে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের চারপাশে নদীর বিশাল জায়গা দখল করে একটি কোম্পানির বলপেন তৈরির কারখানা, কোম্পানি ফাউন্ডেশনের প্রস্তাবিত শিশু বিনোদন কেন্দ্র, জামে মসজিদ ও ব্যাটারি ফ্যাক্টরি গড়ে তোলা হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এসব অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠলেও তা রোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো খুব একটা কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি। তাছাড়া কামরাঙ্গীরচর-হাজারীবাগের সেকশন বেড়িবাঁধসংলগ্ন শাখা নদীর দু’পাশে সেমিপাকা ঘর, দোকান, গ্যারেজ বানানো হয়েছে। এসব দোকান থেকে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক হারে নিয়মিত ভাড়া আদায় করছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব দখল-দূষণ আর চাঁদাবাজিতে সম্পৃক্ত রয়েছে এলাকার অনেক ক্ষমতাশালী ব্যক্তি। যেন বেওয়ারিশ লাশের মতো বুড়িগঙ্গার বুক বালু দিয়ে ভরাট করে রাতারাতি দখল করে নিচ্ছে চিহ্নিত দখলবাজরা। এরপর প্রশাসনের একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশে তারা মালিকানা কাগজপত্র বানিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করার পর তা দখলে নিয়ে পর্যায়ক্রমে বিভিন্নজনের কাছে বিক্রি করে সটকে পড়ছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ‘বুড়িগঙ্গার পশ্চিমের শাখা নদীতে একসময় পালতোলা নৌকা, লঞ্চ, স্ট্রিমার, ইঞ্জিন বোটসহ বড় বড় নৌযান চলাচল করত। স্রোতের কলধ্বনি এক থেকে দুই মাইল দূর থেকে শোনা যেত। অথচ তিন যুগ ধরে চলা দখলে বুড়িগঙ্গা এখন শীর্ণকায়। চকবাজার, লালবাগ, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীচরের মধ্য দিয়ে গত শতকের মাঝামাঝিও বুড়িগঙ্গায় স্বচ্ছ পানি প্রবাহিত হতো।’

তিনি আরও বলেন, ‘লালবাগ নবাবগঞ্জ পার্কসংলগ্ন বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলটি দখল হয়ে গেছে। আগে এখানে লঞ্চ, স্ট্রিমার, ইঞ্জিন বোট নোঙর করত। সরকারের যদি সৎ ইচ্ছা থাকে তাহলে স্বল্প খরচেও নদীর নাব্যতা ফেরানো যায়। ড্রেজিং দরকার হয় না। এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি তুলে নদীর স্রোতের স্বাভাবিক ধারা ফিরিয়ে আনা যায়।’

জানা গেছে, আশির দশক থেকে বুড়িগঙ্গার বুক ভরাট করে ঘরবাড়ি নির্মাণের হিড়িক পড়ে। ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে মিটফোর্ড হাসপাতালের পেছন (দক্ষিণ) থেকে লালবাগ, নবাবগঞ্জ, হাজারীবাগ, মিরপুর, গাবতলী হয়ে টঙ্গী ব্রিজ পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করায় বাঁধের ভেতরে বুড়িগঙ্গার বিশাল এলাকা পড়ে যায়। বুড়িগঙ্গায় দখলের মহোৎসব চলে জোট সরকার আমলে। তখন কিছু প্রভাবশালী বুড়িগঙ্গা দখল প্রক্রিয়া পুরোদমে শুরু করে দেয়। জোট সরকারের আমলে গাবতলী থেকে শুরু করে নবাবগঞ্জ সেকশন পর্যন্ত নদীর বুক বালি-বর্জ্য ফেলে ভরাট করে দখলে নেয় দখলবাজরা।

জানা গেছে, গত বছরের ২৬ জানুয়ারি ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার দখল-দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নৌ-মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক হয়। বৈঠকে চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি সোয়ারিঘাট থেকে দখল-দূষণ রোধে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে বিআইডব্লিউটিএ ও পাউবো। টানা ৩ মাস উচ্ছেদ অভিযান চললেও হঠাৎই তা থেমে যায়। এখনো নদীর বুক দখল করে গড়ে ওঠা অসংখ্য আবাসন ও শিল্পকারখানা উচ্ছেদ করা হয়নি। ওইসব জায়গা দখলমুক্ত করতে বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। এজন্য প্রকল্প বাস্তবায়নে খসড়া মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। এর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান তা ডিএনসিসিকে দিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। গত ১৫ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে বিএসআরএফ সংলাপে নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে জমি অবৈধভাবে দখল করে ইতিমধ্যেই গড়ে উঠেছে হাজার হাজার ছোট বড় স্থায়ী-অস্থায়ী নানা স্থাপনা। বুড়িগঙ্গার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে অবৈধভাবে দখলকৃত সব জমি উদ্ধার করে চ্যানেলটিকে পুনঃখনন করা হবে।

এ জাতীয় আরও খবর