আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

নতুন লকডাউন পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি নয়

করোনাভাইরাসের নাজুক পরিস্থিতি বিবেচনায় শর্ত সাপেক্ষে সার্বিক কার্যাবলি বা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সরকারি সিদ্ধান্তকে আমরা সতর্কতার সঙ্গে স্বাগত জানাই। আমরা দেখেছি, এর আগেও প্রশাসনের তরফ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মানাসহ ১৮ দফা নির্দেশনাও জারি করা হয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি দিন দিন যেভাবে খারাপ হচ্ছে; যেভাবে ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে; যেভাবে হাসপাতালগুলোতে রোগী বাড়ছে এবং প্রয়োজনীয় সেবা ও অক্সিজেনের অভাব দেখা দিচ্ছে; তাতে ‘লকডাউন’-এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকারের অবকাশ নেই। তবে গত বছরের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, এ পরিস্থিতিতে অনেকেই সংকটে পড়েন। বিশেষ করে শ্রমিক শ্রেণি যারা দিনে এনে দিনে খায়, তাদের অনেকের আয় বন্ধ হয়ে যায়। পরিবহন বন্ধ থাকায় এর সঙ্গে সংশ্নিষ্টরাসহ বন্ধ থাকা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকরাও সমস্যায় পড়েন। আমাদের মনে আছে, করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে গত বছর ঈদ ও পহেলা বৈশাখের বাজার ধরতে না পেরে স্থানীয় বাজারকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানে পড়েছিলেন।

অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বেতন কমিয়েছিল, কেউ বিনা বেতনে ছুটি দিয়েছিল। এবারও রমজান মাসের আগে লকডাউনের ঘোষণায় ব্যবসায়ীদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়া স্বাভাবিক। সরকারি প্রজ্ঞাপনে সাত দিনের কথা বলা হলেও ‘লকডাউন’ যে আরও দীর্ঘতর হবে, পরিস্থিতি বিশ্নেষণে সহজেই অনুমেয়। এ সময় সংকটে পড়া মানুষের কথা যেমন প্রশাসনকে ভাবতে হবে, তেমনি প্রতিবেশী সামর্থ্যবানদেরও এগিয়ে আসার বিকল্প নেই। রোববার লকডাউনের প্রজ্ঞাপন জারির দিনই সাত হাজারের ওপর নতুন করে করোনা শনাক্ত হওয়া এবং অর্ধশত মৃত্যুর পরিসংখ্যান যেমন ভয়জাগানিয়া, তেমনি হতাশার। তবে এ অবস্থায় সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য। রোববার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষের সমস্যা হবে। তারপরও জীবনটা আগে। জীবন বাঁচানো সবার করণীয়।

আমরা দেখছি, বিশ্বব্যাপীই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পুনরায় বেড়েছে। তবে গত বছর এ ভাইরাস যতটা নতুন ছিল কিংবা পরিস্থিতি যতটা অপরিচিত ছিল, এ বছর অন্তত সে রকম অবস্থা নেই। গতবারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবারের পরিস্থিতি কতটা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সামাল দেওয়া যায়, সেটিই কাম্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাস্থ্য খাতে গত বছরের সেই বিশৃঙ্খলা এখনও স্পষ্ট। সমকালের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে এসেছে, রোগী বাড়ায় হাসপাতালে ভর্তির সুযোগ কমে আসছে। এতে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে আতঙ্ক আরও বাড়ছে। বিশেষ করে আক্রান্তদের মধ্যে যাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রয়োজন, তারাও সে সুযোগ পাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।

কারণ, এরই মধ্যে রাজধানীর কভিড-১৯ বিশেষায়িত সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আইসিইউর মতো সাধারণ শয্যাও যেন এখন ‘সোনার হরিণ।’ হাসপাতালে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে অ্যাম্বুলেন্সেই রোগীমৃত্যুর ‘ভাইরাল’ ছবি অনেককেই মর্মাহত করেছে। সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করছে, যখন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগী এসে ঢাকায় ভিড় করছে। আমরা মনে করি, দেশের সর্বত্র হাসপাতালগুলোর সেবা মানুষের আস্থায় আসেনি কিংবা সে পর্যায়ে পৌঁছেনি বলেই এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। তাই প্রতিটি জেলাতেই সম্ভাব্য সব সুবিধা সংবলিত আধুনিক হাসপাতাল গড়া জরুরি। লকডাউন পরিস্থিতিতেও সরকারি প্রজ্ঞাপনে যেসব সেবা চালু রাখার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানা ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতেই হবে। মনে রাখতে হবে, সবার দায়িত্বশীল ভূমিকার অভাবেই করোনা পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। বিলম্বে হলেও স্বাস্থ্যবিধি ও নিষেধ মেনে যেমন আমরা নিজে বাঁচতে পারি, তেমনি বাঁচাতে পারি অন্যকেও।