আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

পদ্মার দুই ফেরিঘাট ঈদের আগেই চরম দুর্ভোগ পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হচ্ছে। শিমুলিয়া-বাংলাবাজারে বাস-ট্রাক পারাপার বন্ধ ছয় মাস ধরে।

news-image

ফেরিতে উঠতে পারলে নদী পার হতে সময় লাগে ৩০ মিনিটের মতো। কিন্তু ফেরি পাওয়াই দুষ্কর। যেদিন ঘাটে চাপ বেশি থাকে, সেদিন ফেরি পেতে লাগে ৬ থেকে ৯ ঘণ্টা। আর যেদিন চাপ কম থাকে, সেদিন লাগে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা।

এটা গেল যাত্রীবাহী বাস ও পচনশীল পণ্যবাহী ট্রাকের কথা। যেসব ট্রাক অপচনশীল পণ্য পরিবহন করে, সেসব ট্রাককে দুই থেকে তিন দিনও ফেরিঘাটে বসে থাকতে হয়।

এই দুর্ভোগের চিত্র পদ্মা নদীর পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের। রাজধানী থেকে চলাচলে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার লাখ লাখ মানুষকে প্রতিনিয়ত এই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পদ্মার আরেক রুট শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ঘাট দিয়ে বাস ও বড় ট্রাক নিয়ে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাটে চাপ অত্যন্ত বেশি। কিন্তু যানবাহন পারাপারের জন্য সক্ষমতা সেভাবে বাড়েনি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে পবিত্র ঈদুল ফিতরে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। কারণ, এবার করোনার প্রকোপ কম থাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রামে ঈদ করতে যাবে। করোনার কারণে গত দুই বছর ঈদুল ফিতরে অনেক মানুষ পরিবারসহ গ্রামে যায়নি।

দৌলতদিয়া ঘাটে গতকাল শনিবার বাস ও পচনশীল পণ্যবাহী ট্রাকের সারির দৈর্ঘ্য ছিল তিন কিলোমিটারের মতো। অপচনশীল পণ্যের ট্রাকের সারি আলাদা। চালক ও ফেরির কর্মীরা জানিয়েছেন, গতকাল ভিড় কিছুটা কম ছিল। তারপরও তিন ঘণ্টা অপেক্ষার আগে পারাপারের কোনো সুযোগ ছিল না।

ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের ঘাট প্রতিনিধি মনির হোসেন বলেন, দৌলতদিয়া ঘাটের এই পরিস্থিতি চলছে দুই মাসের বেশি সময় ধরে। এ থেকে উত্তরণের কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন আগে আমরা মালিকপক্ষকে ঈদের আগে ফেরির পরিবর্তে লঞ্চ পারাপার পদ্ধতি চালুর কথা বলেছি।’

উল্লেখ্য, লঞ্চ পারাপার পদ্ধতিতে বাসগুলো ঘাট এলাকায় গিয়ে যাত্রীদের নামিয়ে দেয়। তখন ব্যাগ নিয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে যাত্রীদের ছোট ছোট লঞ্চে উঠতে হয়। ওপারে আবার হেঁটে বাসে উঠতে হয়। অতীতে এই পদ্ধতি চালু ছিল। তবে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে অনেক পরিবহন কোম্পানি ফেরি পারাপারে সরাসরি বাসসেবা চালু করে। এখন দেখা যাচ্ছে, ফেরি ও ঘাটের সক্ষমতার অভাবে আবার সেই পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরতে হচ্ছে।
ফেরি কম, ঘাট কম
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ফেরিঘাটে যানবাহনের চাপ মোটামুটি সারা বছরই থাকে। তবে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাটে চাপ বেড়েছে গত আগস্ট মাসে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায়। তখন ওই ঘাটে চলাচলকারী ফেরি কয়েকবার পদ্মা সেতুর পিলারে ধাক্কা দেয়। শিমুলিয়া-বাংলাবাজারে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেশির ভাগ যানবাহন পদ্মা পাড়ি দিতে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবহার শুরু করে। সেই চাপ এখনো রয়েছে।

ফেরিসেবার দায়িত্ব পালনকারী সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) আরিচা কার্যালয় জানায়, করোনার আগের তুলনায় দৌলতদিয়া ঘাট দিয়ে যানবাহন পারাপার অনেকটাই বেড়েছে। যেমন ২০১৯ সালের মার্চে দিনে গড়ে পার হয়েছে আড়াই হাজার গাড়ি। গত মার্চে সংখ্যাটি বেড়ে ৩ হাজার ৬০০ ছাড়িয়ে যায়।

শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ওই রুটের অধিকাংশ ফেরি দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় আনা হয়। তখন এই রুটে ফেরির সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩। বিআইডব্লিউটিসি জানায়, এখন সচল রয়েছে ১৭টি ফেরি। বাকি ছয়টির মেরামতকাজ চলছে। দৌলতদিয়ার সাতটি ফেরি ভেড়ানোর ঘাটের মধ্যে সচল রয়েছে চারটি। বাকি তিনটির মধ্যে দুটি ২০১৯ সালের ভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হয়। পরবর্তী সময়ে ঘাট দুটি সংস্কার করলেও ব্যবহার উপযোগী হয়নি। বাকি আরেকটি ঘাট প্রায় আট মাস ধরে বন্ধ রয়েছে।

বিআইডব্লিউটিসি আরিচা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) শাহ মো. খালেদ নেওয়াজ বলেন, ঈদের আগে যানবাহনের চাপ বাড়বে। তখন ফেরির সংখ্যা বাড়িয়ে ২২টি করা ও ঘাট একটি বাড়িয়ে ৫টি করার পরিকল্পনা রয়েছে। একসঙ্গে ২২টি ফেরি ও ৫টি ঘাট সচল থাকলে চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।

অবশ্য বিআইডব্লিউটিসির অন্য কর্মকর্তারা নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জানিয়ে বলেন, ঈদে এবার চাপ ব্যাপকভাবে বাড়ার আশঙ্কা আছে। সে তুলনায় প্রস্তুতি সামান্যই। ২২টি ফেরি ও ৫টি ঘাট দিয়ে দিনে চার থেকে সাড়ে চার হাজার যানবাহন পার করা যাবে। কিন্তু যানবাহনের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।

ফেরিঘাট তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ)। সংস্থাটির দৌলতদিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, তাঁদের হিসাবে পাঁচটি ঘাট সচল রয়েছে। এর মধ্যে ২ নম্বর ঘাটটিতে যদি ফেরি না ভেড়ে, তাহলে তাঁদের করণীয় কিছু নেই। তিনি বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ চাইলে প্রয়োজনে আমরা বিকল্প ঘাট তৈরি করতে প্রস্তুত আছি।’

অবশ্য এই পথে চলাচলকারী যাত্রীরা বলছেন, সরকারি সংস্থার কাজ নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে মানুষকে মানসম্মত সেবা দেওয়া, দায় একজন আরেকজনের ওপর চাপানো নয়।

শিমুলিয়ায় বাস-ট্রাক পারাপার বন্ধ
ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার পথে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করেছে সরকার। ফেরিঘাট ছাড়া এই পথে কোথাও থামতে হয় না। পদ্মা সেতু চালু হলে এই পথে ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত যেতে বাসের ৪০ মিনিটের মতো সময় লাগার কথা।

২০২০ সালের মার্চে এই এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু উন্নত ফেরিসেবার অভাবে এই এক্সপ্রেসওয়ের সুফল এখন ততটা পাওয়া যাচ্ছে না।

বিআইডব্লিউটিসি সূত্র জানায়, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে বর্তমানে দুটি ডাম্ব ফেরিসহ ছয়টি ফেরি সচল আছে। এগুলো প্রায় ছয় মাস ধরে ভোর পাঁচটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টা চলাচল করে। সন্ধ্যার পর শিমুলিয়া থেকে শরীয়তপুরের জাজিরার মাঝিকান্দি ফেরিঘাটে ফেরি চলাচল শুরু হয়। তবে দিন–রাত কখনোই ফেরিতে বাস ও ভারী যানবাহন পারাপার করা হয় না।

বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ফেরিঘাটে চারটি ফেরি বাড়ানো হবে। মোট দাঁড়াবে ১০টিতে। ঈদেও এ রুটে বাস-ট্রাক চলাচলের জন্য অনুমতি দেওয়া হবে না।

ঈদুল ফিতরে গত বছর ঘরমুখী মানুষের অতিরিক্ত চাপ ছিল। তখন এই রুটে ফেরিগুলোয় যানবাহনের পরিবর্তে শুধু যাত্রী পারাপার করা হয়। গত বছরের ১২ মে ফেরিতেই মারা যান পাঁচ যাত্রী। অসুস্থ হয়ে পড়েন আরও অন্তত ২০ জন। তখন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, মৃত্যুর কারণ তীব্র রোদ, গরম ও প্রচণ্ড ভিড়ে অক্সিজেনের অভাব এবং পদদলিত হওয়া।
দুর্ভোগ বছরজুড়েই
ফেরিসেবা থেকে বিআইডব্লিউটিসির আয় বাড়ছে। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য বলছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ফেরি থেকে সংস্থাটির আয় ছিল প্রায় ২৮৫ কোটি টাকা, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বেড়ে ৩৫৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। এর পরের অর্থবছরগুলোর হিসাব তাদের ওয়েবসাইটে নেই।

আয় বাড়লেও ফেরিসেবায় দুর্ভোগ থাকে বছরজুড়েই। শীতে কুয়াশার কারণে প্রায়ই ফেরি চলাচল বন্ধ থাকে। বর্ষায় স্রোত বেশি থাকলে ফেরিগুলো ঠিকমতো চলতে পারে না। অভিযোগ আছে, ঘাটে জটের মধ্যে ‘ঘুষ নিয়ে’ কিছু যানবাহন সিরিয়াল ভেঙে আগে পারাপার করা হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়। দুর্ভোগে থাকে সাধারণ মানুষ।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, একটি রুটের যানবাহনের একটি বড় অংশ যখন আরেকটি রুটে যায়, তখন চাপ বাড়া স্বাভাবিক। কিন্তু প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সময় তো অনেক পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ঠেকা দিয়ে কাজ চালানোর একটি প্রবণতা রয়েছে। যে কারণে মানুষের ভোগান্তি বেশি হয়। উৎসব উপলক্ষে পরিবহনে চাপ বাড়বেই। কিন্তু ব্যবস্থাপনা যদি সেকেলে থেকে যায়, তাহলে মানুষের উৎসবের আনন্দ মাটি হয়ে যায়।

এ জাতীয় আরও খবর

নারায়নগঞ্জে ৪১৪ জন শিক্ষককের আড়াই কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম

দৌলতদিয়ায় ৭ ফেরিঘাটের ৪টিই বিকল, যানবাহনের দীর্ঘ সারি

পানির নিচে পন্টুন, ঘাটে যানবাহনের দীর্ঘ সারি

ছাত্রদল করা সন্তানের জনক হলেন থানা ছাত্রলীগের সহসভাপতি

যমুনা নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন

চাঁদপুরের ডিসিকে বদলি, তিন জেলায় নতুন ডিসি

গাফফার চৌধুরী আর নেই

প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে ভূমি দখলের পাঁয়তারার অভিযোগ

কুমিল্লার মানবজমিন প্রতিনিধিসহ সারাদেশের সাংবাদিকদের উপর হামলার প্রতিবাদে সোচ্চার রূপগঞ্জ প্রেসক্লাব ॥ প্রতিবাদ সভা, মানববন্ধন-বিক্ষোভ মিছিল

চাকরির নামে টাকা আত্মসাৎ গ্রেপ্তার ২

মহাসড়কে গাছ ফেলে ডাকাতি করতো তারা, গ্রেফতার ৬

বনের ভেতর সিসা তৈরির কারখানা, হুমকির মুখে পরিবেশ