আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

পুলিশ চায় সব উজি পিস্তল বাজেয়াপ্ত গত কয়েক বছরে আমদানি হয়েছে ১১১টি অস্ত্র, বিক্রি ৫৩টি

news-image

দেশে আমদানি করা, বিক্রি হওয়া এবং মজুদ থাকা সব উজি পিস্তল বাজেয়াপ্ত করতে চায় পুলিশ সদর দপ্তর। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া প্রতিবেদনে এমন সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। পাশাপাশি অস্ত্র আমদানির নীতিমালাবিরোধী সব ধরনের অস্ত্র দেশে আনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশও করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
গত ২০ আগস্ট রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে মিনাল শরীফ নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে ডিবির তেজগাঁও বিভাগ। পরে তার বাসা থেকে লাইসেন্স করা উজি পিস্তল জব্দ করা হয়। এর পরই সেমি অটোমেটিক এই অস্ত্র নিয়ে পুলিশ প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) উজি পিস্তলের বিষয়ে তদন্ত শুরু করে। এর পরই জানা যায়, শুধু ওই ব্যক্তির হাতেই নয়, ছয়টি অস্ত্র আমদানিকারী প্রতিষ্ঠান আইনের অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে ৯১টি উজি পিস্তল ও ২০টি উজি রাইফেল আমদানি করেছে। এর মধ্যে ৪৯টি পিস্তল ও চারটি রাইফেল বিক্রিও হয়েছে।
ডিবি তদন্ত শেষে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের দপ্তরে প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হলে তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। ওই তদন্ত শেষ করে পুলিশ সদর দপ্তর সম্প্রতি উজি পিস্তলের বিষয়ে বেশকিছু পর্যবেক্ষণ ও আটটি সুপারিশসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দেয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরই মধ্যে যেসব আমদানিকারক উজি রাইফেলের নামে উজি পিস্তল আমদানি করে বিক্রি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া কাস্টমস থেকে অস্ত্রের চালান খালাসের সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত অস্ত্র বিশেষজ্ঞ টিমের উপস্থিতি ও পরিদর্শন বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সাধারণত পিস্তলে একটি ম্যাগাজিন ও আট রাউন্ড গুলি ব্যবহার করা যায়। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও সেই ধরনের পিস্তল রয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলের তৈরি উজি পিস্তলে দুটি ম্যাগাজিনে ২০ রাউন্ড গুলি ব্যবহার করা যায়। এটি দেখতেও বেশ ভারী।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জাহাংগীর আলম সমকালকে বলেন, ওই অস্ত্রগুলো আমদানি এবং বিক্রয়ে কী ধরনের ব্যত্যয় হয়েছিল তা যাচাই করা হচ্ছে। পুলিশের দেওয়া প্রতিবেদনের আলোকে বৈঠকও হয়েছে।
উজি পিস্তল নিয়ে পুলিশ সদরের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, উজি পয়েন্ট টু টু বোরের পিস্তলটি অত্যাধুনিক এবং এর ম্যাগাজিন ক্যাপাসিটি ২০ রাউন্ড। এটি জনসাধারণের জন্য অনুমোদিত অন্যান্য পয়েন্ট টু টু বোরের পিস্তল থেকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন। এটি বিক্রয় বা অন্য কোনো উপায়ে জঙ্গি গোষ্ঠী বা সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে যে কোনো বড় ধরনের অপরাধ পরিকল্পনা নেওয়াসহ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। তাই উজি অস্ত্রটি আমদানি, বিক্রয় ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রশ্নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শর্তারোপ করাসহ দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আমদানিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পয়েন্ট টুটু বোরের রাইফেল ক্রয়ের অনুমোদন নিয়ে পয়েন্ট টুটু বোরের উজি পিস্তল আমদানি করেছে। পাশাপাশি লাইসেন্সধারী ব্যক্তির রাইফেল ক্রয়ের অনুমতি থাকা সত্ত্বেও আমদানিকারকরা জেনেশুনে পিস্তল বিক্রি করেছে। এক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই আইন লঙ্ঘন করেছে।
পুলিশের সুপারিশে বলা হয়েছে, একবার ট্রিগার চাপলে একাধিক গুলি বের হয় বা স্বয়ংক্রিয়- এমন যে কোনো বোরের অস্ত্র আমদানি নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। পয়েন্ট টু টু বোরের উজি রাইফেলসহ সব ধরনের অস্ত্রের স্পেয়ারপার্টস, ওজন ও দৈর্ঘ্য সুনির্দিষ্ট করার সুপারিশও করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এতে আরও বলা হয়, অস্ত্র আমদানির ক্ষেত্রে ম্যাগাজিনের ধারণক্ষমতা সর্বোচ্চ কত হবে, তা নির্ধারণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি তা আমদানির সময়ে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করার নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। অস্ত্র ছাড়া শুধু খালি ম্যাগাজিন আমদানি বা উৎপাদনের ক্ষেত্রেও নীতিমালা নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। যে কোনো অস্ত্রের লাইসেন্সে ম্যাগাজিনের ধারণক্ষমতা সুনির্দিষ্টভাবে উলেল্গখ করা যেতে পারে, পুলিশ সদর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।
যাদের হাতে উজি অস্ত্র :পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারাদেশে ৮৪টি বৈধ লাইসেন্সধারী অস্ত্র ব্যবসায়ী রয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি প্রতিষ্ঠান সরাসরি বিদেশ থেকে বৈধভাবে অস্ত্র আমদানি করে থাকে। অন্য বৈধ ব্যবসায়ীরা তাদের কাছ থেকে অস্ত্র কিনে তা লাইসেন্সের বিপরীতে বিক্রি করে।
গত কয়েক বছরে ১১১টি উজি অস্ত্র আমদানি করা হয়েছে। ৫৩টি বিক্রি করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিক্রি হওয়া এসব উজি পিস্তল মাদক বিক্রির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া মিনাল শরীফ ছাড়াও একাধিক রাজনৈতিক নেতা, উপজেলা চেয়ারম্যান, ব্যবসায়ী ও পুলিশের একজন সার্জেন্ট তার ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্সের বিপরীতে কিনেছেন। বাকি ৫৮টি অস্ত্র আমদানিকারকদের কাছে মজুদ রয়েছে।