আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

বগুড়ায় ‘বালু সন্ত্রাস’!

news-image

মাটির নিচে পাইপ দিয়ে আবাদি জমির তলদেশ থেকে বালু তুলতে প্রতি সিএফটি (স্কয়ার ফিট) খরচ পড়ে মাত্র তিন টাকা। প্রশাসনসহ স্থানীয় সন্ত্রাসী বাবদ খরচ আরো এক টাকা। চার টাকা সিএফটির বালু বিক্রি করা হয় ১২ থেকে ১৩ টাকায়। বিনিয়োগের তুলনায় লাভ দ্বিগুণের বেশি হওয়ায় বালু ব্যবসা এখন সন্ত্রাসীদের দখলে। পেশাদার ব্যবসায়ীরা বালুমহাল দখল করতে ব্যবহার করছেন সন্ত্রাসীদের। বগুড়া শহরের কমপক্ষে ৫০টি পয়েন্টে এভাবেই চলছে ‘বালু সন্ত্রাস’! জমি থেকে বালু তোলার কারণে বিভিন্ন এলাকায় ভূমিধসের ঘটনাও ঘটছে। বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে খুনসহ অস্ত্রবাজির ঘটনা তো হরহামেশা ঘটছেই।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বগুড়া শহরের ৫০টি পয়েন্টে বালু ব্যবসা নেতৃত্বদানকারীরা হলেন পল্লীমঙ্গলে ফারুক, খালেক, মানিক, সালেক, আজাদ, মিজানুর; নওদাপাড়ায় নুর আলম ও আলম; জোড়গাছায় ফজলু ও জুয়েল; গোবর্ধনপুরে বেলাল, খামারকান্দি মধ্য কাতালিতে দেলোয়ার ও স্বপন; মানিকচকে বাবলু, মতিন ও মিরাজ। তাঁরা সবাই ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে জড়িত। তবে জেলা যুবলীগের সহসভাপতি আলহাজ শেখ জানান, যারা বালু তোলে তারা দলীয় পোস্টধারী কেউ নয়। তবে মিছিল-মিটিংয়ে তারা কোনো কোনো সময় হাজির হয়।

আগে বগুড়া শহরসহ বিভিন্ন উপজেলায় বালু তোলা হতো মূলত করতোয়া ও বাঙ্গালী নদীকে ঘিরে। এখন সেই পরিসর বিভিন্ন এলাকার আবাদি জমির ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবেশদূষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে এভাবে বালু তোলার প্রক্রিয়া এখন লোভনীয় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এ কারণে শহরতলিতে আবাদি জমি লিজ দেওয়ার প্রবণতাও বেড়ে গেছে। মাত্র ১ শতাংশ জায়গা লিজ দেওয়া হচ্ছে ৫০ থেকে এক লাখ টাকায়। শহরতলির কমপক্ষে ৫০টি পয়েন্টে চলছে জমি থেকে বালু তোলার কাজ। এ অঞ্চলে কোনো বালুমহাল না থাকার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের সঙ্গে যোগ হয়েছে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের একাধিক চক্র। পুলিশের তথ্য অনুসারে বালু ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জের ধরে রাজাপুর এলাকায় আমিনুল ইসলাম দিপু নামের এক যুবদল নেতাকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খুন হন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা জুয়েল। মানিকচক এলাকার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সহযোগীসহ খুন হন রাইসুল। সদর উপজেলার ভাটকান্দি গ্রামে খুন হন শাহীন প্রামাণিক নামের এক বালু ব্যবসায়ী। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার সামনে বালু তোলা নিয়ে খুন হন আওয়ামী লীগকর্মী শফিক।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পরিবেশ বিপর্যয়ের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সহযোগিতায় বগুড়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে দিন-রাত বালু উঠছে। মেশিন দিয়ে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু তোলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শত শত একর আবাদি জমি ও নদীর তীরসংলগ্ন ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। অনেক এলাকায় ভূমিধসের কারণে রাস্তাঘাট দেবে গেছে। ফাটল দেখা গেছে অনেক স্থানে। এলাকাবাসীর বাধা এবং জেলা প্রশাসনের তৎপরতার পরও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সরাসরি হস্তক্ষেপে চলছে এই বালু বাণিজ্য।

বগুড়ার ধুনটে যমুনা, বাঙ্গালী ও ইছামতি নদীর কিছু এলাকা বালুদস্যুরা দখল করে নিয়েছে। সেখানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি জিলানী হোসেন। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাই খোকনের ছোট ভাই। জিলানীর নেতৃত্বেই তিন নদীর ১৪ পয়েন্ট থেকে দিন-রাত বালু উঠছে। শ্যালো মেশিন নদীতে বসিয়ে দুই-তিন কিলোমিটার দূরে পাইপ দিয়ে ফেলা হচ্ছে বালু। এতে নদীর পাশে থাকা শত শত একর আবাদি জমি, বসতবাড়ি ও রাস্তা হুমকির মুখে পড়েছে।

এসব এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, নৌকার ওপর শ্যালো মেশিন তুলে নদীর গভীর থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ভাসমান অবস্থায় বালু তোলা হচ্ছে। এ ছাড়া নদীর বুকে জেগে ওঠা চর থেকে বালু কেটে ট্রাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। ওই বালু আশপাশের এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে বেশি দামে। যমুনা নদীর শহরাবাড়ি ঘাট এলাকা থেকে পুকুরিয়া গ্রাম পর্যন্ত পাঁচটি পয়েন্টে বালু তোলা হচ্ছে। বালু উত্তোলনকারীরা হলেন গোলাম রব্বানী, আব্দুস সালাম, সুজন, শহিদুল হক ও এনামুল হক। তাঁরা বলেছেন বালু তুলছেন যুবলীগ নেতা জিলানীর নির্দেশে। তবে জিলানী হোসেন বলেন, ‘আমি নিজে মেশিন ভাড়া দিই না। ঠিকাদারিসহ অন্য কোনো কাজে বালুর দরকার হলে তখন বালু তুলে থাকি। আর আমার নাম ভাঙিয়ে কেউ বালু তুলে থাকলে সে ব্যাপারে আমি অবগত নই।’

ইছামতি নদী থেকে বালু তোলার ফলে ধুনট-কাজিপুর সড়কের অনেক স্থানে ধস নেমেছে। একইভাবে ধস নেমেছে আশপাশের অনেক জমিতে। ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান জানান, অভিযোগ এসেছে অনেক। এদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একই অবস্থা বগুড়া শহরের অভ্যন্তরে করতোয়া নদীর। শহরের মালতীনগর, ভাটকান্দি, শ্মশানঘাট এলাকায় নদীর মাঝ থেকে শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু উঠছে দিন-রাত। এলাকার চিহ্নিত ব্যবসায়ীরা বালু তুলছে শহর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক রফি নেওয়াজ খান রবিনের নির্দেশে। বালু তুলে তা প্রতি ট্রাক বিক্রি করা হচ্ছে এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ টাকায়। ভাটকান্দি এলাকার বাসিন্দা মোতালেব ফকির জানান, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী হওয়ায় ভয়ে কেউ কিছু বলে না। কিন্তু তাদের এলাকার জমি, রাস্তাঘাট দেবে যাচ্ছে। তবে অভিযোগের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ নেতা রফি নেওয়াজ খান রবিন বলেন, তিনি সাত বছর আগে এ ধরনের একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এখন এসবের সঙ্গে নেই। তাঁর নাম ভাঙিয়ে এসব কাজ করা হচ্ছে।

এদিকে কাহালু, দুপচাঁচিয়া, শিবগঞ্জ উপজেলার সীমান্ত এলাকা দিয়ে বয়ে যাওয়া নাগর নদীর মাইলের পর মাইল দখল করে রেখেছে ইটভাটা মালিক ও বালুদস্যুরা। বছরের পর পর ইট তৈরির জন্য মাটিকাটা এবং বালু তোলার ফলে এ উপজেলার কমপক্ষে ৫০টি গ্রামে ভূমিধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নদীতে মেশিন বসিয়ে বালু তোলা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর আখ্যায়িত করে রাজশাহী বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মাসুদুজ্জামান বলেন, কোনো স্থানকে বালুমহাল ঘোষণা করা হলে তাঁদের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু গত এক বছরের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কাউকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। আর বগুড়ায় বালুমহাল হওয়ার মতো তেমন কোনো নদী নেই। যেভাবে বালু তোলা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ অবৈধ। এতে পরিবেশের ভয়াবহ বিপর্যয়, যেমন ভূমিধস, ভাঙন ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।