আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

বাংলাদেশিদের কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা এখনো সুইস ব্যাংকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশিদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ টাকা গচ্ছিত

সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে (সুইস ব্যাংক) বাংলাদেশিদের রাখা টাকার পাহাড় জমেছে। ১০ বছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের সঞ্চয় বেড়েছে ১৫৬ শতাংশ। যদিও কালো টাকার বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থানে ভারত-পাকিস্তানসহ প্রতিবেশী সব দেশ থেকেই আমানত অনেক কমেছে সুইজারল্যান্ডে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশিদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত রয়েছে। আর প্রথম স্থানে রয়েছে ভারত। এর পরই রয়েছে পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার অবস্থান। কিন্তু ভারতীয় নাগরিকদের গচ্ছিত থাকা সম্পদের পরিমাণ অর্ধেকে নেমেছে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। আর পকিস্তানি নাগরিকদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণও পাঁচ বছরের ব্যবধানে কমেছে এক-তৃতীয়াংশ। কিন্তু বাংলাদেশি নাগরিকদের কমেছে মাত্র ১২৬ কোটি টাকা। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সুইজারল্যান্ডে গোপনীয়তা কিছুটা কমায় অনেকে এখন অবৈধ টাকা জমা রাখার জন্য ঝুঁকছে, লুক্সেমবার্গ, কেম্যান আইল্যান্ড, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, পানামা কিংবা বারমুডার মতো ট্যাক্স হ্যাভেনের দিকে।

২০১৯ সালে দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ ৬০ কোটি ৩০ লাখ ফ্রাংক, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ পাঁচ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে বাংলাদেশিদের মোট সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল ৬১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্র্যাংক; যা বাংলাদেশি মুদ্রায় পাঁচ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা, অর্থাৎ এক বছরে ১২৬ কোটি টাকা কমেছে।
সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) গতকাল বৃহস্পতিবার ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড-২০১৮’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বাংলাদেশিদের অর্থ জমার এ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে পাকিস্তানিদের ৫০ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে সন্তোষজনক হারে কমেনি অর্থপাচার। বাজেটে কালো টাকা সাদা করতে প্রতিবছর নানা সুযোগ দিলেও দেশে বিনিয়োগ না হয়ে অধিকাংশ কালো টাকাই পাচার হয়ে যাচ্ছে। কোনোভাবেই তা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তাই অর্থপাচার বন্ধে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালে বাংলাদেশিদের জমা রাখা টাকার পরিমাণ ছিল ৪৮ কোটি ১৩ লাখ সুইস ফ্রাঁ বা চার হাজার ১৬০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের তুলনায় অবশ্য ২০১৭ সালে সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশিদের অর্থ জমার পরিমাণ কমে গিয়েছিল।

সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের গত ১০ বছরের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৮ সালে সবচেয়ে বেশি টাকা জমা করেছেন বাংলাদেশিরা। সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকার বড় একটি অংশই পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। অল্প কিছু অংশ বৈধ পদ্ধতিতে জমা করেছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। যদিও ২০১৯ সালে সুইস ব্যাংকে এই দুই প্রতিবেশী দেশের আমানত কমেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাগরিকত্ব গোপন রেখে জমা করা টাকার তথ্য উঠে আসেনি এতে। সুইস ব্যাংকে আমানতের হিসাবে ২০১৯ সালেও বিশ্বে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে যুক্তরাজ্য। এদিকে সুইস ব্যাংকগুলোতে এ বছর ভারতীয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর জমাকৃত অর্থের পরিমাণ কমেছে। তথ্যানুযায়ী, এ বছর ভারতীয়দের জমাকৃত অর্থ ৬ শতাংশ কমে ২০১৯ সালে হয়েছে ৮৯৯ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ (৬৬২৫ কোটি রুপি)। এর ফলে সুইস ব্যাংকগুলোতে ভারতীয় গ্রাহকদের অর্থ টানা দ্বিতীয় বছর কমল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাচারকৃত অর্থ চিহ্নিতকরণ ও টাকা ফেরত আনার বিষয়টি অনেক জটিল প্রক্রিয়া। প্রথমে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক পাচারকৃত অর্থ চিহ্নিত করে তদন্তের পর মামলা করতে হয়। এরপর আদালত রায় দিলেই কেবল প্রক্রিয়া শুরু করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে অনুসন্ধান বা তদন্ত পর্যায়ে পাচারের বিষয়টি নিশ্চিত হলে তদন্তকারী সংস্থা ওই দেশে পাচারের অর্থ অবরুদ্ধ করার জন্য মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স বা এমএলএর জন্য অনুরোধ করতে পারে। এরপর ওই দেশের আদালত থেকে পাচারের অর্থ অবরুদ্ধ করার অনুমতি নিয়ে কয়েকটি ধাপের পর দুই দেশের কেন্দ্রীয় সংস্থার মাধ্যমে পাচারের অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। তবে এ ক্ষেত্রে ওই দেশের আদালতের কাছে বিষয়টি প্রমাণসাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য হতে হবে।

তবে অর্থপাচার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছেন অর্থনীতিবিদরা। জানতে চাইলে অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটির বছরওয়ারী হিসাবে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের এই অঙ্ক গড়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা। এখন এই করোনাকালে আমরা যখন জন অর্থায়ন বা ত্রাণের জন্য অর্থ পাচ্ছি না, তখন অনেকেই রব তুলেছেন কেন আমরা এই পাচারকৃত টাকা ফিরিয়ে আনতে পারছি না। দেশে আইনের শাসন ও অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে এমন প্রবণতা কমবে। সেই সঙ্গে দেশের আন্তর্দেশীয় বাণিজ্য, করপোরেট করহার এবং বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনা বা নীতিমালাকে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের প্রচলিত নীতিমালার আলোকে যুগোপযোগী এবং সহজ করতে হবে।’ তিনি বলেন, শুধু দেশপ্রেম দিয়ে পুঁজি পাচার বন্ধ বা পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনা অলীক স্বপ্নই থেকে যাবে। তদুপরি বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থার বর্তমান অবয়বে বা কাঠামোয় আইনি লড়াইয়ে না জিতে পাচারকৃত কোনো টাকাই ফেরত আনা সম্ভব নয়। আপৎকালে তো একেবারেই অসম্ভব।

সাধারণত সুইস ব্যাংক অর্থের উৎস গোপন রাখে। এসএনবির তথ্যানুযায়ী, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের বছরও সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ বেড়েছিল। যেমন ২০১৩ সালে বিভিন্ন সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা রাখা অর্থের পরিমাণ ছিল ৩৭ কোটি ১৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় তিন হাজার ২১৪ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫১ কোটি সুইস ফ্রাঁ বা চার হাজার ৪০৮ কোটি টাকা।

জানতে চাইলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সুইস ব্যাংকগুলোতে এখন আর অর্থ রাখে না সে রকম। টাকা রাখার আরো অনেক জায়গা আছে। বাংলাদেশ থেকে যত টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে সেটা সব সুইস অ্যাকাউন্টে যাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, সাধারণত পণ্য আমদানির মাধ্যমেই অর্থাৎ ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে দেশের অর্থ পাচার হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে কালো টাকা পাচার নিয়ন্ত্রণে অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপগুলো আরো জোরদার করতে হবে। ভারতের মতো বাংলাদেশ সরকারকেও সুইস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এগুলো যে অবৈধ অর্থ, সেটা প্রমাণ করে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। যদি অর্থ ফেরত আনার ব্যবস্থা করা না যায় তবে ভবিষ্যতে দেশের বাইরে টাকা পাঠানোর প্রবণতা বাড়বে।

এদিকে জিএফআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৪৮টি উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশের বেশি অর্থ পাচার হয় চীন থেকে। এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৯তম। তবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। পাকিস্তানের যাঁরা সুইস ব্যাংকে টাকা রাখেন তাঁরা অনেকেই জেলে আছেন। বাংলাদেশের যাঁরা পাচার করছেন তাঁদের ওপর কোনো চাপ নেই।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে ২০০৫ সালে ৪২৬ কোটি ডলার, ২০০৬ সালে ৩৩৭ কোটি ডলার, পরের বছর ২০০৭ সালে ৪০৯ কোটি ডলার পাচার হয়। ২০০৮ সালে পাচারের পরিমাণ ৬৪৪ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ২০০৯ সালে ৫১০ কোটি ডলার। ২০১০ সালে ৫৪০ কোটি ডলার, ২০১১ সালে ৫৯২ কোটি ডলার ও ২০১২ সালে ৭২২ কোটি ডলার অর্থপাচার হয়।

এ জাতীয় আরও খবর

যত্রতত্র পশুরহাটের অনুমতি দেয়া যাবে না : ওবায়দুল কাদের

ভেন্টিলেটর কাজে লাগে না, মানুষ মরে যায়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

করোনার ভয়াবহতা এখনও বাকি : ডব্লিওএইচও

আগামীকাল সকাল ১১টা থেকে সদরঘাটে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য নিবে তদন্ত কমিটি

সুন্দরগঞ্জে শিশু ধর্ষণচেষ্টা, যুবক গ্রেপ্তার

ভাগ্নিকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেন, এরপর বাবা-মামা মিলে হত্যা

ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনায় মহিলা পরিষদের উদ্বেগ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারে সম্পাদক পরিষদের তীব্র নিন্দা

ওয়ারীতে গৃহবধূকে হত্যার অভিযোগে স্বামী তিন দিনের রিমান্ডে

ডাক্তারদের থাকা-খাওয়ার কোনো দুর্নীতি হয়নি : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

জাহিদকে সরিয়ে মতিয়াকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করার দাবি সংসদে

২৪ ঘন্টায় করোনায় রেকর্ড সংখ্যক ৬৪ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত সর্বোচ্চ ৩,৬৮২ জন