আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

বিপ্লবীর স্মৃতি মুছে দিতে চায় ভূমিদস্যুরা জেএম সেনের বাড়ি ভাঙচুর

news-image

চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানার রহমতগঞ্জে অবিভক্ত ভারতের কংগ্রেস নেতা যতীন্দ্র মোহন সেনের পৈতৃক বাড়ি। যেটি তার বাবা প্রখ্যাত আইনজীবী ও কংগ্রেস নেতা যাত্রামোহন সেনের নাম অনুসারে জেএম সেন ভবন হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটির ওপর ভূমিদস্যুদের নজর পড়েছে। নানাভাবে জায়গাটি অনেকে হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও কেউ ঐতিহাসিক স্থাপনাটিতে হাত দেওয়ার দুঃসাহস দেখাননি। সম্প্রতি এম ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি ‘অপকৌশলে’ আদালতের নির্দেশনা এনে ঐতিহাসিক ভবনটির একাংশ গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে সেখানে অবস্থানও করছেন তিনি ও তার লোকজন। বাড়ির দেয়ালে সাইনবোর্ডও টাঙিয়েছেন।
সর্বশেষ বাংলাদেশ জরিপ (বিএস) অনুযায়ী, বাড়িটির ৩৮ শতক জায়গার মধ্যে ২৩ শতক অর্পিত সম্পত্তি, যার জিম্মাদার জেলা প্রশাসক। বাকি ১৫ শতক জায়গার মালিক ভবনটিতে অবস্থিত শিশুবাগ স্কুল। ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর দাবি, তারা যাত্রামোহন সেনগুপ্তের নাতি মিলন কান্তি সেনগুপ্তের কাছ থেকে জায়গাটি কিনে নিয়েছেন। কিন্তু স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, মিলন কান্তি জন্ম থেকে মানসিক ভারসাম্যহীন। জমিদার যাত্রামোহনের সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে অনেকেই তাকে প্রলুব্ধ করে স্বাক্ষর নিয়েছেন। তাদেরই একজন হয়তো ফরিদ উদ্দিন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্পিত সম্পত্তি কারও বিক্রির সুযোগ নেই। কেউ কিনলেও তাকে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালে আবেদন করে মালিকানা প্রমাণ করতে হবে। ট্রাইব্যুনাল আদেশ দিলেই কেবল জায়গার মালিক হতে পারবেন সংশ্নিষ্ট ব্যক্তি। অন্যথায় অর্পিত সম্পত্তির মালিক সরকার।
এদিকে জেএম সেন ভবনের একাংশ গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর ক্ষোভে ফেটে পড়েন দেশের বিশিষ্টজনসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা এটি বিপ্লবী স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আন্দোলন করে আসছেন। ইতোমধ্যে আদালত ভবনটি ভাঙার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।
অর্পিত সম্পত্তির ‘অবৈধ’ মালিকানা দাবি
সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় বাকলিয়া সার্কেলের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার রহমতগঞ্জ মৌজায় বিএস জরিপের ৩৮৬ খতিয়ানের ১০৯৬ দাগে জায়গা রয়েছে ১৯ গণ্ডা এক কড়া অর্থাৎ ৩৮ শতকের চেয়ে একটু বেশি। এর মধ্যে ২৩ শতক অর্পিত সম্পত্তি ও ১৫ শতক জায়গা শিশুবাগ স্কুলের নামে রয়েছে। গত ৪ জানুয়ারি এম ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বাড়িটির মালিকানা দাবি করে বুলডোজার দিয়ে একাংশ ভেঙে দেন। খবর পেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত স্থানীয় লোকজন নিয়ে রুখে দাঁড়ালে দখলদাররা পিছু হটেন।
এ প্রসঙ্গে ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা আদালত থেকে রায় পেয়েছি। ভবনটি আদালত ভেঙেছে, আমরা ভাঙিনি।’ তার ছেলে ফরহাদ উদ্দিন চৌধুরী সমকালকে বলেন, ‘আমার বাবা ১৯৮০ সালে মিলন কান্তি সেনগুপ্তের সঙ্গে জমিটি কেনার জন্য বায়না করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি জমিটি রেজিস্ট্রি না করে দেওয়ায় ২০০৫ সালে আমরা আদালতে যাই। গত ১৪ ডিসেম্বর আদালত আমাদের দখল বুঝিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। গত ৪ জানুয়ারি আদালত আমাদের দখল বুঝিয়ে দিয়েছেন।’ আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তাদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আদালত ভবন ভাঙার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। অবস্থানের ওপর দেননি।’
এ প্রসঙ্গে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল হাসান বলেন, ‘আদালতের নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী বাড়িটিতে কারও অবস্থানের সুযোগ নেই। কেউ যদি আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে, তাহলে বিষয়টি আদালতের নজরে আনব আমরা।’ অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনালের সরকার পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকে মোহাম্মদ আবু হানিফ বলেন, ‘আদালত থেকে দখল বুঝে নেওয়ার ডিক্রি পেলেও সরকারের ‘ক’ তালিকাভুক্ত সম্পত্তির মালিক কেউ হতে পারবেন না। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন অনুযায়ী তাকে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করে মালিকানা প্রমাণ করতে হবে।
মিলন কান্তি সেনগুপ্ত কে?
১৯৬৮ সালে ভারত সরকার প্রকাশিত যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্তের বায়োগ্রাফি লিখেছেন তার ভাই রনেন্দ্র মোহন সেনগুপ্তের স্ত্রী পদ্মিনী সেনগুপ্ত। ‘বিল্ডার্স অব মডার্ন ইন্ডিয়া-দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত’ বইয়ে চট্টগ্রামের জমিদার প্রখ্যাত আইনজীবী যাত্রামোহন সেন ও বিনোদিনী দেবী দম্পতির ১৫ সন্তানের উল্লেখ রয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩তম সন্তান বীরেন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত। দখলদার ফরিদ উদ্দিনের দাবি, মিলন কান্তি সেনগুপ্ত বীরেন্দ্র মোহনের সন্তান। তবে এর সত্যতা কেউ নিশ্চিত করতে পারেননি। মিলন কান্তি সেনগুপ্ত এখন চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বরমা গ্রামে থাকেন। ভবঘুরে জীবন যাপন করেন তিনি। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
চন্দনাইশের বরমা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলেন, ‘যাত্রামোহন সেনগুপ্তের নাতি হিসেবে পরিচয় দেন মিলন কান্তি সেনগুপ্ত। তাকে জন্মলগ্ন থেকেই মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে দেখেছি। চট্টগ্রাম শহর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামে বিশাল সম্পত্তির মালিক ছিলেন জমিদার যাত্রামোহন সেন। পরে তার উত্তরাধিকাররা দেশত্যাগ করলে বিভিন্নজন তাদের জায়গা-জমি দখল করে নিয়েছে। অনেকে মিলন কান্তি সেনগুপ্তকে প্রলুব্ধ করে জায়গা হাতিয়ে নিতে তার স্বাক্ষরও নিয়েছেন।’ তার কথার সত্যতা মিলেছে দখলদার এম ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর ছেলে ফরহাদ উদ্দিন চৌধুরীর কথায়। তিনিও স্বীকার করেছেন আদালতে মামলা করার পর অন্তত ২০ জন ব্যক্তি একই জায়গার দখলদার দাবি করে পিটিশন দিয়েছেন। যারা মিলন কান্তি সেনগুপ্তের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়েছেন।

ইতিহাস বলছে, ১৯৩৩ সালে ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের রাজধানী রাঁচিতে কারারুদ্ধ অবস্থায় মারা যান যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত। তার মৃত্যুর পর চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জে স্বামীর পৈতৃক বাড়িতে ফিরে আসেন তার স্ত্রী নেলী সেনগুপ্তা। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন তিনি। ওই বছর ইন্দিরা গান্ধীর অনুরোধে ভারতে চিকিৎসার জন্য যান তিনি। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে ফিরে আসেন, দেখেন তার বাড়িটি দখল হয়ে গেছে। বাড়িটি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে সরকার নথিভুক্ত করেছে। তখন তিনি আবার ভারতে ফিরে যান। সে সময় তার বাড়িটি ফিরিয়ে দিতে আন্দোলন করেছিলেন তৎকালীন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. অনুপম সেন। পরে বাড়িটি জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে সেখানে বাংলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন শামসুদ্দিন মো. ইসহাক নামে এক শিক্ষক। এখন তার সন্তানদের পরিচালনায় শিশুবাগ নামে একটি স্কুল রয়েছে সেখানে। স্বাধীনতার পর থেকে এখানে স্কুল পরিচালনা করলেও ভবনটির কোনো ধরনের পরিবর্ধন-পরিবর্তন করেননি তারা। কিন্তু দখলদাররা সেই স্কুলটিও উচ্ছেদ করেছেন।
বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন বলেন, ‘ঐতিহাসিক ওই ভবনকে সরকার ইজারা দিয়ে অন্যায় করেছে। ভবনটি চট্টগ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ। আমরা চাই না সেটি হারিয়ে যাক। ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে ভবনটি সরকার অধিগ্রহণ করে সেখানে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি করছি।’
অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, বাড়িটি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে গণ্য আছে। জেলা প্রশাসক এর কাস্টডিয়ান, কিন্তু মালিক নন। দখলদার ফরিদ উদ্দিনের পক্ষে আদালতের আদেশের যে নথি দেখানো হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে মিলন সেনগুপ্ত বনাম ফরিদ। যে জমির মালিক মিলন সেনগুপ্ত নন, বিক্রির ক্ষেত্রে তিনি কীভাবে পক্ষভুক্ত হন। তার তো বিক্রির কোনো আইনি অধিকার নেই। জাল দলিল তৈরি করে আদালতকে বিভ্রান্ত করে তারা একটা আদেশ এনেছেন, যেটা অবৈধ।