আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার খুনখারাবি টেন্ডারবাজি চাঁদাবাজি রাজনৈতিক সংঘর্ষ সবখানে সক্রিয়, সীমান্ত হয়ে অবৈধ অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে

news-image

সারা দেশে বাড়ছে বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার। প্রভাবশালী রাজনীতিক থেকে শুরু করে শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ বৈধভাবে পাওয়া অস্ত্র ব্যবহার করছে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল ও আধিপত্য বিস্তারে। এমনকি অবৈধভাবে ভাড়াও দেওয়া হচ্ছে এসব বৈধ অস্ত্র। প্রকাশ্যে এসব অস্ত্র উঁচিয়ে একদিকে যেমন ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে, তেমনি ব্যবহার হচ্ছে চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, এমনকি সরকারি উচ্ছেদ অভিযান ঠেকাতেও। এসব অস্ত্র দিয়ে ঘটছে খুনও। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু নির্বাচনে এসব অস্ত্রের অবৈধ মহড়া দেখা গেছে। রাজনৈতিক দলের পদপদবি ব্যবহার করে অনেকেই সরকারি নিষেধাজ্ঞা না মেনে জেলা/উপজেলা শহরের সরকারি অফিসে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করে ঘুরে বেড়ায়। এ ছাড়া ছড়িয়ে পড়েছে অবৈধ অস্ত্র। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের মতে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীরা আবারও তৎপর। দেশের সীমান্ত হয়ে অত্যাধুনিক সব অবৈধ অস্ত্র দেশে ঢুকছে। ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। সম্প্রতি নোয়াখালীতে একজন প্রভাবশালী রাজনীতিক অভিযোগ করেছেন, সারা দেশে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করলেও কমছে না অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি।

চট্টগ্রাম মহানগরের লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুমের দুটি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। গত ২২ জুলাই লালখান বাজার ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ এফ এম কবির আহমেদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মাসুমের আগ্নেয়াস্ত্রের বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। বৈধ অস্ত্র দিয়ে মাসুম বিভিন্ন সময় অবৈধ কর্মকান্ড পরিচালনা করেছেন বলে ওই অভিযোগে উল্লেখ করেন কাউন্সিলর। বিশেষ বিবেচনায় প্রদান করা অস্ত্রের লাইসেন্স নম্বর ৫৪৪৪/ডবলমুরিং ও ৩৩/খুলশী বাতিল করে বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার বন্ধের আবেদন করেন তিনি। ৩১ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ দিদারুল আলম মাসুমের আগ্নেয়াস্ত্র বাতিলসংক্রান্ত একটি নির্দেশনা দেয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সূত্র জানান, গত আট বছরে বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে প্রায় ৪ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে মন্ত্রণালয়ে। একই সময়ে অবৈধ কাজে ব্যবহারের জন্য সারা দেশে প্রায় ৫০০ বৈধ অস্ত্রধারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ৩১৮টির লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৬টি অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।

অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি : সারা দেশে বেড়েছে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি। গ্রাম থেকে শহরের অলিগলিতে প্রায়ই হচ্ছে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার। গুলি করে চুরি, ছিনতাই হচ্ছে অহরহ। পাড়া-মহল্লার ঝগড়া-বিবাদে ঘটছে গুলি। কিশোর গ্যাংদের হাতে মিলছে অস্ত্র। মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের নেটওয়ার্ক ঠিক রাখতে ব্যবহার করছে অস্ত্র। সন্ত্রাসী, আন্ডারওয়ার্ল্ডের হাতে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি তো পুরনো বিষয়। অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন দেশে যখন অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি থাকে তখন গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। তখন তুচ্ছ কারণেই অস্ত্রের ব্যবহার করা হয়।
সূত্র বলছেন, নানা কারণে দেশে এখন অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বেড়ে গেছে অপরাধপ্রবণতা। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে অস্ত্র ব্যবসায়ীরা তৎপর হয়ে উঠেছে। সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে অস্ত্র ঢুকছে দেশে। আবার কখনো সীমান্তে কর্মরত বেশ কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় চোরাচালানের মাধ্যমে নিয়ে আসা হয় অস্ত্র। সীমান্ত পার হলেই এসব মারণাস্ত্র চলে যাচ্ছে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, জঙ্গি, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, চরমপন্থিদের হাতে। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা দিয়ে অহরহ ঢুকছে আগ্নেয়াস্ত্র। এসব অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। ছোটখাটো অপরাধী থেকে শুরু করে শীর্ষসন্ত্রাসী-গডফাদাররা মজুদ করছে অস্ত্রের ভান্ডার। আবার লাইসেন্স নিয়ে অনেকেই অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার করছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যেভাবে গোলাগুলি ঘটছে আগামীতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি আরও জোরালো ভূমিকা না রাখে তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হবে। এ ছাড়া অস্ত্রের চালান দেশে প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে আরও বেশি নজরদারি বাড়াতে হবে।

অপরাধবিজ্ঞানী তৌহিদুল হক বলেন, ‘অপরাধীরা সব সময়ই অস্ত্রের মজুদ রাখে। শুধু তারা সময়-সুযোগ মতো জানান দেওয়ার অপেক্ষায় থাকে। তাই অপরাধী যে-ই হোক মূল বিষয়টা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। দেখতে হবে তারা কতটুকু তৎপর। কারণ সিন্ডিকেটরাই দেশে অস্ত্রের চালান নিয়ে আসছে। আর এ সিন্ডিকেটদের সহযোগিতা করছেন খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্য। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটা স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে তাদের আয়ত্তের বাইরে কী পরিমাণ অস্ত্র আছে। এসব উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যেতে হবে। তা না হলে সমাজের সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ভীতিকর অবস্থা তৈরি হবে।’ তিনি বলেন, ‘প্রকাশ্য গোলাগুলিই ভীতির কারণ তৈরি করে দিচ্ছে। আর এসব আগ্নেয়াস্ত্র যদি অপরাধীর কাছে মজুদ থাকে তবে সমাজের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও বেগ পেতে হবে। কারণ যতগুলো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সামাল দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘অতীতে জাতীয় নির্বাচনে অস্ত্রের মহড়া, গোলাগুলি ঘটেছে অহরহ। এ ধরনের ঘটনা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।’