আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

মালিকদের চাপে সড়ক আইনে সাজা লাঘব!

মাত্র তিন বছর আগে সড়ক পরিবহন আইন সংশোধন করেছিল সরকার। জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে আইনটিতে সংযোজন করা হয়েছিল কঠিন কঠিন ধারা। এসব ধারা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। সরকারি সূত্রের খবর, বিধিমালা করে পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করার আগেই আইনটিতে কাঁচি চালানো হচ্ছে, অর্থাৎ আবার সংশোধন করা হচ্ছে।

সূত্র বলছে, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের দাবির চাপে পড়ে সরকার আইনটি শুধু সংশোধনই করছে না, অর্থদন্ড ও কারাদন্ড কমিয়ে আইনটিকে নখদন্তহীন বাঘে পরিণত করছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো, যত্রতত্র পার্কিং, যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো, ট্রাফিক সাইন না মানা, বেশি ভাড়া আদায়, অতিরিক্ত ওজন বহন করা, হর্ন বা অন্য কোনো উপায়ে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি শব্দদূষণ সৃষ্টি করার মতো যেসব অপরাধ হরদম হচ্ছে, সে সবের দন্ড কমিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে সংশোধনীতে। এতে সড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়বে বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।

সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ে সমস্যা দেখা দেওয়ায় এর কিছু ধারা সংশোধনের প্রয়োজন বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ ছাড়া মোটরযান মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের দাবি তো রয়েছেই। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ২৬তম সভায় সড়ক পরিবহন আইনের প্রায়োগিক দিক নিয়ে মতামত দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও রেলপথ মন্ত্রীদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি ৭টি সভা করে সড়ক পরিবহন আইনের কোন কোন ধারা, উপধারা এবং উপ-উপধারা সংশোধন করতে হবে, সে বিষয়ে মতামত দেয়। সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ২৮তম সভায় যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তিন মন্ত্রীর এসব সুপারিশ সংশোধনের সিদ্ধান্ত হয়। এসব মতামতের ওপর ভিত্তি করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সংশোধনের খসড়া করে মতামতের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। একই সঙ্গে জনমত যাচাইয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। আইনটি সংশোধনের বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের চেয়ে মন্ত্রী বা রাজনৈতিক নির্বাহীরা যেসব ধারা-উপধারা সংশোধনের জন্য মতামত দিয়েছেন, সেগুলোতেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশোধনের বিষয়ে কর্মকর্তা পর্যায়ে ভিন্ন মত এলেও মন্ত্রীদের প্রস্তাবই প্রাধান্য পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

আটটি মন্ত্রণালয় ছাড়াও এ বিষয়ে মতামত দেয় বিআরটিসি, অটোরিকশা হালকাযান পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন, পণ্য পরিবহন মালিক ও শ্রমিক ফেডারেশন, ইলিয়াস কাঞ্চনের নিরাপদ সড়ক চাই, ঢাকা আহছানিয়া মিশন, ব্র্যাক, ডেভকন লিমিটেড। জনৈক আরিফুল ইসলাম ও নূর ইসলাম ছাড়াও ৬২ জন ব্যক্তি ওয়েবসাইটে মতামত দেন।

ঢাকা আহছানিয়া মিশন শিশুদের জন্য নিরাপদ আসন নামে একটি উপধারা সংযোজনের প্রস্তাব দেয়। ওয়েবসাইটে পাওয়া মতামতের ৩৭টি ছিল নিরাপদ সড়ক চাই-এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চনের দেওয়া মতামতের সঙ্গে একমত পোষণ করে একই মতামত। অবশিষ্ট ২৫ জন সাধারণ মতামত দিয়েছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে।

ডেভকন লিমিটেড ‘যাত্রীবাহী মোটরযান’ শব্দের বদলে গণপরিবহন শব্দ ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। গণপরিবহন রাখা হলেও ডেভকন নিবন্ধিত লেবেল ওজন সংশোধনের প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়নি। ঢাকা আহছানিয়া মিশনের শিশুদের জন্য গণপরিবহনে নিরাপদ আসন নামে একটি উপধারা সংযোজনের প্রস্তাব নাকচ করা হয়েছে। পণ্য পরিবহন মালিক ও শ্রমিক ফেডারেশন উপধারা ১০ সংশোধনের প্রস্তাব করে। তবে যুক্তিযুক্ত না হওয়ায় তা গ্রহণ করা হয়নি।

আইনে ১২৬টি ধারা থাকলেও সংজ্ঞা আছে ৫৪টি। এত বেশি সংজ্ঞা প্রয়োজন নেই বলে এক বৈঠকে জানান মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা।

সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২১ ভেটিং পর্যায়ে রয়েছে। খসড়া আইনে যেভাবে সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলো বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ কারণে খসড়া আইন অনুমোদন হলে পুনরায় বিধিমালায় সংশোধন আনতে হবে।

২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য অষ্টম শ্রেণি পাস বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণের শর্ত ছিল। কিন্তু খসড়া আইনে শর্ত সাপেক্ষে তা পঞ্চম শ্রেণি করা হচ্ছে। শর্তে বলা হয়েছে, অষ্টম শ্রেণি বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, তবে অনুমোদিত তিন চাকার মোটরযান চালানোর ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পঞ্চম শ্রেণি বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

কন্ডাক্টর বা সুপারভাইজারের লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি ন্যূনতম ১০ বছর মোটরযানের কাজ করে যদি ড্রাইভার হিসেবে দক্ষ হয়ে ওঠে এবং ড্রাইভি কম্পিটেন্সি টেস্ট পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়, তাহলে তাকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া যাবে। বর্তমান আইনে কন্ডাক্টরের লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক থাকলেও খসড়ায় সুপারভাইজারের জন্যও এ বিধান করা হচ্ছে।

ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরযান বা গণপরিবহন চালানোর বিধিনিষেধ অমান্যের আর্থিক জরিমানা ২৫ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ১৫ হাজার টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে।

কন্ট্রাক্ট ক্যারিজের মিটার অবৈধভাবে পরিবর্তন বা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করার জন্য ৬ মাসের কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে। সংশোধনীতে এ অপরাধের জন্য ৩ মাসের কারাদন্ড বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ট্রাফিক সাইন বা সংকেতের ব্যবহার না মানা ব্যক্তিকে এক মাসের কারাদন্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডের বিধান রয়েছে। প্রস্তাবিত খসড়া আইনে কারাদন্ডের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। আর অর্থদন্ড কমিয়ে ১ হাজার টাকা করার বিধান রাখা হচ্ছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় অর্থদন্ড ২ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছিল।

অতিরিক্ত ওজন বহন করার জন্য ১ বছরের কারাদন্ড বা ১ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডের বিধান রয়েছে ২০১৮ সালের আইনে। নতুন খসড়ায় তা তিন-চতুর্থাংশ কমিয়ে ৩ মাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থদন্ড ২৫ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।

নির্ধারিত শব্দমাত্রার অতিরিক্ত শব্দ সৃষ্টির জন্য ৩ মাসের কারাদন্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। খসড়ায় তা ১ মাসের কারাদন্ড বা ৫ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে নামিয়ে আনা হয়েছে। পরিবেশদূষণের জন্য ৩ মাসের কারাদন্ড বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে। খসড়ায় তা এক মাসের কারাদ- বা ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডের বিধান রয়েছে।

যত্রতত্র পার্কিং, যাত্রী বা পণ্য ওঠানো-নামানোর আর্থিক দন্ড ৫ হাজার টাকা। খসড়ায় তা ১ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।

ওভারলোডিং বা নিয়ন্ত্রণহীন মোটরযান চালানোর ফলে দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতিসাধনের দন্ড একই রাখা হলেও এই ধারায় দ্রুত গাড়ি চালানো, বেপরোয়া, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের মতো কিছু শব্দগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলে বা প্রাণহানি হলে এ-সংক্রান্ত অপরাধ প্যানাল কোডের বিধান অনুযায়ী অপরাধ বিবেচিত হবে। তবে শর্ত রয়েছে, প্যানাল কোডে যা-ই থাকুক না কেন, এ-সংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি ৫ বছরের কারাদন্ড, ৫ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড। খসড়ায় কারাদন্ড বহাল রাখার কথা বলা হলেও অর্থদন্ড ৩ লাখ টাকা নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

মাত্র তিন বছর আগে সড়ক পরিবহন আইন করা হয়েছে। আইনটি পুরোদমে কার্যকর করার আগেই সংশোধন করা হচ্ছে। শুধু সড়ক পরিবহন আইনই নয়, সড়ক নিরাপদ রাখতে নানা ধরনের নীতিমালাও করছে সরকার। এত আইনবিধি হলেও সড়ক নিরাপদ হচ্ছে না। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘ আগের আইনটি ভালো ছিল। ২০১৮ সালের সংশোধনীতে তার ৫০ শতাংশও রাখা হয়নি। সেটাও আবার হালকা-পাতলা করা হচ্ছে। আইনটির জন্ম হয়েছিল চমৎকারভাবে। কিন্তু বিভিন্ন চাপের কারণে আইনটির যে তীক্ষèতা ছিল, ধার ছিল তা ভোঁতা করে দেওয়া হচ্ছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক সামসুল আলম বলেন, আইন প্রয়োগের জন্য করা হয় না। আইন করা হয় ভয় দেখানোর জন্য। ২০১৮ সালে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে একটা নতুন ও কঠোর আইন করা হয়েছিল। এর কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না।’

এ জাতীয় আরও খবর

জনগণের টাকায় আমাদের সংসার চলে : ডিসিদের রাষ্ট্রপতি

সিদ্ধিরগঞ্জে সেনা সদস্য হত্যার ঘটনায় ৩ ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার

কুমিল্লায় ৪ ইটভাটার মালিককে ২১ লাখ টাকা জরিমানা

টাঙ্গাইলে তিন ইটভাটা ধ্বংস, ৯ টিকে সাড়ে ২৭ লাখ টাকা জরিমানা

সাড়ে ৬ কোটি টাকা পাচারের চেষ্টা ঢাকার আরএম সোর্সিংয়ের

বহিষ্কার করলেও দল পরিবর্তন করবো না : তৈমূর

নদীতে মাটি কাটায় ট্রাক্টর জ্বালিয়ে দিলেন ইউএনও

পুলিশের বিরুদ্ধে আ.লীগ নেতার বাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ

‘ডিসিরাও উন্নয়ন প্রকল্প তদারকি করবেন’

ফেরি ও ঘাট সংকটে তীব্র যানজট

দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর স্পিডবোট ব্যবসা বন্ধের অভিযোগ

নাসিক নির্বাচন : পুত্রবধূর কাঁধে চড়ে বৃদ্ধার ভোট