আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

মাসোহারা পেলেই ব্যাটারিচালিত রিকশা ‘বৈধ’

news-image

প্যাডেলচালিত রিকশা-ভ্যানের সঙ্গে মোটর যুক্ত করে তাকে বানানো হয়েছে অটোরিকশা, অটোভ্যান। বিদ্যুতে চার্জ হওয়া এসব অটোরিকশা, অটোভ্যান ও ইজিবাইক এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো রাজধানীতে।

২০১৭ সালে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনা উপেক্ষা করে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশকে ম্যানেজ করে বিভিন্ন অলিতে-গলিতে এখনো চলছে এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা। আর এসব অটোরিকশায় চড়ে প্রায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সারাজীবনের জন্য কেউ হচ্ছেন পঙ্গু, কেউ হারাচ্ছেন প্রাণ।

সচেতন যাত্রীমহলের অভিযোগ, পুলিশ, ট্রাফিক বা হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার কারণে এসব যানবাহন গলি থেকে শুরু করে সড়ক-মহাসড়কে চলছে। তারা বলছেন, সড়ক-মহাসড়ককে ৩ চাকার বাহন মুক্ত রাখতে হলে কঠোর নজরদারির দরকার। এদিকে হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশ বলছে, দায়িত্বে কোনো অবহেলা নেই। বেশিরভাগ সময় চালকরা পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে মহাসড়কে গাড়ি চালান।

নাম প্রকাশ প্রকাশে অনিচ্ছুক অটোরিকশার চালক ও মালিকরা বলছেন, বিধি অনুযায়ী অবৈধ হলেও রাস্তায় চলতে তাদের কোনো অসুবিধা হয় না। কারণ একদিকে যেমন এলাকার নেতাদের ম্যানেজ করে চলেন, তেমনি সড়কে তাদের বিরুদ্ধে যাদের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, সেই পুলিশকে তারা ম্যানেজ করে চলেন। অটোরিকশা চলাচল বন্ধ হলে স্থানীয় নেতা ও পুলিশ উভয় পক্ষই বড় অঙ্কের মাসোহারা হারাবে। এ কারণে অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করার রাস্তা সহজ নয়।

সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত প্যাডেলচালিত রিকশার পরিসংখ্যান আছে। তাতে দেখা যায়, রাজধানীতে প্যাডেলচালিত বৈধ রিকশার চেয়ে অবৈধ রিকশা প্রায় ১০ গুণ বেশি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, তাদের কাছে নিবন্ধিত রিকশার সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার। আর দক্ষিণ সিটিতে সেই সংখ্যা প্রায় ৫২ হাজার। দুই সিটি মিলিয়ে বৈধ রিকশা ৭৯ হাজার ৫৪৭টি।

তবে, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি গবেষণা বলছে, রাজধানীতে চলাচলকারী রিকশার সংখ্যা ১১ লাখের বেশি। এরমধ্যে প্রায় ১০ লাখই অবৈধ।

সরেজমিনে রাজধানীর মুগদা, মান্ডা, বাসাবো, হাজারীবাগ, জিগাতলা, কামরাঙ্গীরচর, দক্ষিণখান, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, বাড্ডা, জুরাইন, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, শনির আখড়া, ডেমরা, বাসাবো ও মাদারটেকসহ রাজধানীর ছোট বড় প্রায় ৫০টি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রত্যেক এলাকায়ই ব্যাটারিচালিত রিকশার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। বিভিন্ন এলাকার রিকশাচালক ও মালিকদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের প্রফেসর দীলিপ দত্ত সাংবাদিকদের বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ব্যাটারির এসিড, সিসা পরিবেশের চেয়ে মানবদেহের জন্য বেশি ক্ষতিকর। এতে থাকে সালফিউরিক এসিডসহ অন্যান্য রাসায়নিক সিসা। এসব সিসা বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে থাকে। এই উপাদান মানুষের মস্তিষ্কের বেশি ক্ষতি করে। এর প্রভাবে মানুষ প্রতিবন্ধী হয়ে পড়তে পারেন। আবার মানুষের ক্যানসারও হতে পারে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব অটোরিকশার চালক ও মালিকদের কাছ থেকে মাসোহারা তোলা হয় নিয়মিত। প্রতি মাসে এর পরিমাণ ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত। সে হিসাবে বছরে আড়াই থেকে সাড়ে তিনশ কোটি টাকা চাঁদা দিয়ে থাকেন অটোরিকশার চালক-মালিকরা! অভিযোগ রয়েছে, এসব টাকার ভাগ স্থানীয় নামধারী কিছু নেতাকর্মী ও থানা পুলিশের মধ্যে ‘ভাগ-বাটোয়ারা’ হয়। এই বিপুল অঙ্কের অর্থের উৎস সহজে বন্ধ করতে রাজি নন কেউ। ফলে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজধানীর রাজপথে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।

নাম প্রকাশ প্রকাশে অনিচ্ছুক চালক-মালিকরা বলছেন, অটোরিকশা চালানোর জন্য প্রতিটি এলাকাতেই সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা আছে। থানা পুলিশ ও স্থানীয় নেতাদের যৌথ উদ্যোগে লাইনম্যানদের মাধ্যমে প্রতিটি রিকশার জন্য একটি করে কার্ড ইস্যু করা হয়। এই কার্ডে উল্লেখ থাকে, কোন অটোরিকশা কোন এলাকা পর্যন্ত চলতে পারবে। আর এই কার্ডের জন্য প্রতি মাসে কমপক্ষে এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা করে দিতে হয় লাইনম্যানকে। এই টাকা না দিলে নির্ধারিত এলাকার মধ্যে অটোরিকশা চালানো সম্ভব হয় না। অন্যদিকে কোনো অটোরিকশা কার্ডে উল্লেখ করা এলাকার বাইরে গেলে সেটি ধরা পড়লে আবার ট্রাফিক পুলিশকে ‘খুশি করে’ গাড়ি ছাড়িয়ে আনতে হয়। তাতে একেকবার খরচ সর্বনিম্ন দুই শত টাকা থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত পড়ে।

মান্ডা এরাকার রিকশা মালিক আবদুল হোসেন বলেন, ‘রিকশা থেকে চলাচলে অটোরিকশা সময় সাশ্রয়ী। রিকশা ও সিএনজি থেকে ভাড়াও কম। একসঙ্গে বেশি মানুষ যাতায়াত করতে পারেন। অল্প টাকায় বেশি দূরত্বে যাতায়াত করা সম্ভব। সেইসঙ্গে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে ব্যাপকভাবে। চালকরাও হচ্ছেন সাবলম্বী। পাশাপাশি রিকশা চালানোর মতো কঠিন কায়িক পরিশ্রম থেকে ইজিবাইক চালানো খুবই সহজ।’

ডেমরার কোনাপাড়ার এলাকার অটোরিকশাচালক আনিস বলেন, ‘স্থানীয় নেতা-কর্মীদের দৈনিক চাঁদা দিতে হয়। যা মাস শেষে ২ হাজার টাকা। প্রায় আড়াই বছর ধরে এভাবে অটোরিকশা চালাচ্ছি।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারে পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ‘মহাসড়কে দ্রুত ও ধীরগতির বাহন একসঙ্গে চলাচলই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মহাসড়কে যদি বিভিন্ন গতির যানবাহন একসঙ্গে চলে আর সেগুলোর মধ্যে যদি গতির পার্থক্য বেশি হয়, তাহলে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বেড়ে যায়।’

তবে, নগর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, নির্দেশনার পর এসব অটোরিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইক মালিক শ্রমিকদের কিছুটা সময় দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে মালিক শ্রমিকরা অযান্ত্রিক যে বাহনকে যান্ত্রিক বাহনে রূপ নিয়েছেন, তা পুনরায় অযান্ত্রিক বাহনে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জনসংযোগ কর্মকর্তা ও মুখপাত্র আবু নাছের গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মোটর বা ইঞ্জিন সংযোজন করে যেসব অযান্ত্রিক বাহনকে ইঞ্জিনচালিত বাহনে রূপান্তর করা হয়েছে, সেগুলো একটি গণ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যারা অযান্ত্রিক বাহনে যন্ত্র সংযোজন করে সেগুলো যান্ত্রিক বাহনে রূপান্তর করছেন, আমরা তাদের এ নির্দেশনা মানার আহ্বান জানাচ্ছি।’

সিটি করপোরেশনের নির্দেশনা না মানলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘এখনো অনেকে এ নির্দেশনা মানছেন না। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বিষয়টি সার্বিকভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।’

রাজধানীর একটি এলাকার লাইনম্যান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, ‘সাধারণত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালানোর জন্য প্রতিটি এলাকায়ই সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যবস্থা থাকে। প্রথমে কোনো গাড়ি রাস্তায় নামাতে হলে আমাদের অফিসে বড় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এককালীন ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা চাঁদা দেন গাড়ির মালিকরা। এরপর যারা গাড়ি বের বা যেদিনই রাস্তায় চালালে প্রতিটি গাড়ি হতে দৈনিক ৮০ টাকা হতে ১০০ টাকা চাঁদা তোলা হয়। আমার নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ২০০/২৫০ গাড়ি চলাচল করে। সেই হিসাবে আমার এলাকায় দৈনিক ২৫ হাজার টাকা চাঁদা আর মাসিক সাড়ে ৭ লাখ চাঁদা তোলা হয়।’

রাজধানীর ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টারের ট্রাফিক সার্জেন ইমরান হোসেন বলেন, ‘অটোরিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইকের চালকরা আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাস্তায় গাড়ি চালায়। মাঝে মাঝে আমরা তাদের গাড়িসহ আটক করি। তবে, মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের ছেড়ে দেই। একইসঙ্গে প্রধান সড়কে গাড়ি না চালাতেও নিষেধ করি। তবে তাদের কাছ থেকে আমরা কোনো আর্থিক সুবিধা নেই না।’

এসব বিষয়ে জানতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিকের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মো. আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।গত ২০ জুন সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সড়ক পরিবহন টাস্কফোর্সের সভা শেষে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘দেশে নসিমন, করিমন, ভটভটি এবং ঢাকা শহরে বিভিন্ন রকমের অটোরিকশা চলছে। আমরা এখনো যানবাহনের সঠিক ব্যবস্থা করতে পারিনি। গ্রামাঞ্চলে সুন্দর রাস্তা হয়ে গেছে। সেখানে রিকশা, বাইসাইকেল কিংবা মোটরসাইকেল ছাড়া পর্যাপ্ত যানবাহন নেই। সেজন্য যানবাহনের বিকল্প হিসেবে নসিমন, করিমন চলছে। এটা নিয়েও আমাদের আলোচনা হবে। যেন শিগগিরই এসব বাহনকে পরিমিতভাবে চালানো যায়। আর ফাইনালি বন্ধও করা যায়। আমরা সেটা নিয়েও কাজ করবো।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ইজিবাইক যথেষ্ট পরিমাণে এসে গেছে। ছোট-ছোট গলিতে এগুলো চলার কথা ছিল। কিন্তু এখন সর্বত্র বিচরণ করছে। আমাদের ঢাকা শহরে এই পর্যন্ত ১৩ হাজার মোটরচালিত রিকশা ও ভ্যান ডেস্ট্রোয় (ধ্বংস) করা হয়েছে। ইজিবাইকগুলো নিয়ন্ত্রণ করে দেওয়া হচ্ছে। এসব বাহনের চালকরা যেন তাদের নির্দিষ্ট স্থান থেকে বের হতে না পারে, হাইওয়ে বা বড় রাস্তায় না আসতে পারে, এটাও আমরা ক্রমান্বয়ে বন্ধ করে দেবো।’

এ জাতীয় আরও খবর

নির্বাচনী বিরোধে প্রাণ গেল ১ জনের

এসআই ফখরুল কাণ্ডে অতিষ্ঠ এক ‘মা’!

৩৫ বছর বয়সী একজন রাজনৈতিক নেত্রী স্কুল পোশাকে আন্দোলন করছেন: তথ্যমন্ত্রী

৬ ছাত্র হত্যার ফাঁসির আসামিকে নৌকার মনোনয়ন, পরে প্রত্যাহার

ইরানের বন্দরে পাকিস্তানের ৩ যুদ্ধজাহাজ

নভেম্বরে ১ লাখের বেশি কর্মী বিদেশ গেছেন

দুই ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েও করোনায় ঢাবি অধ্যাপকের মৃত্যু

ছাইয়ে তলিয়ে গেছে গ্রাম, চাপা পড়েছে গাড়ি

ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ: কয়রায় বেড়িবাঁধ ভেঙে দুই গ্রাম প্লাবিত

অর্থপাচারকারী প্রিন্স মুসা, মিন্টু-তাবিথদের তালিকা হাইকোর্টে, যা বললেন আদালত

সন্তান বিক্রি করতে যাওয়া সেই বাবা পেলেন অটোরিকশা

মৃত ভেবে সীমান্তে শাহাজানকে ফেলে দিয়েছিল মামারা