আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

লকডাউনে দেশ -স্বাস্থ্যবিধি ভেঙে মানুষ গ্রামে

news-image

দেশজুড়ে আজ থেকে শুরু হওয়া সাত দিনের লকডাউনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ছেড়ে গ্রামে পাড়ি জমাতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন নগরবাসী। কে কার আগে বাস-লঞ্চ-ট্রেনের টিকিট পাবেন এবং গন্তব্যে পৌঁছাবেন সেই প্রতিযোগিতা চলেছে গতকাল সারাদিন। কোথাও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের বালাই ছিল না। অর্ধেক আসন খালি রেখে যাত্রী পরিবহনের নির্দেশনা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাস-লঞ্চের মালিকরা তা লঙ্ঘন করেছেন। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করারও অভিযোগ পাওয়া গেছে অনেক। পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা দাবি করেন, তারা সরকারের নির্দেশনা মেনে যানবাহন চালিয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে যাত্রীরা জোর করে লঞ্চ-বাসে উঠে পড়েছেন। তাদের থামানো সম্ভব হয়নি।

গতকাল রাজধানীর একাধিক বাস টার্মিনালে গিয়ে যেন ঈদের আগের দিনগুলোর চিত্র চোখে পড়েছে।

বেলা যত গড়িয়েছে, টার্মিনালগুলোতে ততই বেড়েছে যাত্রীর চাপ। দূরপাল্লার বাসগুলোর টিকিট যেন সোনার হরিণে পরিণত হয়। অনেকে কালোবাজারে টিকিট কিনে নেন। টার্মিনালকেন্দ্রিক দালালচক্র সেই সুযোগে যাত্রীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় বাড়তি অর্থ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি থাকলেও তৎপরতা ছিল না বললেই চলে।

গাবতলী সংলগ্ন আমিনবাজার ব্রিজের ওপর বিকেলে দেখা যায়, কয়েকশ যাত্রী অপেক্ষা করছেন বাসের জন্য। জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গাগামী যাত্রী ইসরাফিল জানান, তার কাছ থেকে নন-এসি বাসের জন্য এক হাজার ২০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে আমিনবাজার ব্রিজের ওপর থেকে উঠতে হবে। সেজন্য দাঁড়িয়ে আছেন।

অন্য যাত্রীরা জানালেন, তারাও বিভিন্ন বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। কেউ সাতক্ষীরা এক্সপ্রেস, কেউ রয়েল এক্সপ্রেস, কেউ পূর্বাশা পরিবহনের বাসের যাত্রী হবেন। বাসগুলো ব্রিজের ওপর পৌঁছাতেই যাত্রীরা উঠে পড়ছেন। কোনো আসনই ফাঁকা যাচ্ছে না। আবার ভাড়াও নেওয়া হচ্ছে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি। রাজশাহীগামী নাবিল পরিবহনের যাত্রী আলম জানান, লকডাউনের খবর জানার পরই তিনি টিকিটের জন্য চেষ্টা করতে থাকেন। গতকাল কল্যাণপুরে কাউন্টারে গিয়ে একটি টিকিট পান। কিন্তু তাকে বলা হয়, পাশে যাত্রী বসলে কোনো অভিযোগ করা যাবে না।

একই অবস্থা দেখা গেছে মহাখালী, সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালেও। প্রত্যেকটি টার্মিনালেই ঘরমুখো মানুষের ভিড়। অনেকে পরিবার-পরিজনসহ যাচ্ছেন অথবা নিজে ঢাকায় থেকে পরিবারকে বাড়িতে পাঠানোর চেষ্টা করছেন।

সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আধুনিক ও বিলাসবহুল কিছু বাস স্বাস্থ্যবিধি ও আসন ফাঁকা রাখার নির্দেশনা মেনে ঢাকা ছাড়লেও দূরপাল্লার অন্য বাসগুলো এ নির্দেশনা একেবারেই অনুসরণ করেনি।

অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের বাসগুলোতে এসবের কোনো বালাই ছিল না। রাতের বাসগুলোও রাজধানী থেকে ছেড়ে গেছে সরকারি নির্দেশনাগুলো অমান্য করেই। লঞ্চগুলোতেও ছিল উপচেপড়া ভিড়।

তবে কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, আন্তঃনগর ও দূরপাল্লার ট্রেনগুলো স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করেই স্টেশন ছাড়ছে। কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে বেশ তৎপর। কিন্তু যাত্রীর চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। লোকাল ট্রেনগুলোতে বাড়তি যাত্রীর চিত্র চোখে পড়েছে। তবে ট্রেনগুলো এয়ারপোর্ট বা টঙ্গী-গাজীপুর স্টেশনে পৌঁছলেই যাত্রীরা হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে যায়। কর্তৃপক্ষ তা সামাল দিতে পারেনি।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার শাহাদাৎ আলী সমকালকে বলেন, কমলাপুর থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই ট্রেনগুলো ছাড়া হয়েছে। কিন্তু কিছু জায়গায় যাত্রীর চাপের কারণে নিয়ম মানা যায়নি। সেখানে যাত্রীরা জোরপূর্বক ট্রেনে উঠে পড়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, অধিকাংশ দূরপাল্লার বাস নিয়ম মেনে চলেছে। বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটি নিয়ম অনুসরণ করেনি। কিছু বাসে যাত্রীরা জোর করে উঠেছে। বিআরটিএ-পুলিশের এটা দেখার দায়িত্ব ছিল। ঢাকা শহরের ভেতরে ঈদের মতো যাত্রীর চাপ তৈরি হয়েছিল। ফলে শৃঙ্খলা ছিল না। আন্তঃজেলা বাসগুলোতেও যাত্রীদের চাপের কারণে নিয়ম-কানুন অনুসরণ করা সম্ভব হয়নি। তাদের কেউ কেউ অতিরিক্ত ভাড়া নিয়েছে।

সদরঘাটে উপচেপড়া ভিড়: সদরঘাটমুখী যাত্রীদের চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। পল্টন থেকে সদরঘাট পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় কিলোমিটারজুড়ে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। দুপুর থেকেই যাত্রীরা লঞ্চে অবস্থান নিতে শুরু করেন। অনেকে দাগ দিয়ে ডেকের জায়গার সীমাও চিহ্নিত করে রাখেন। প্রায় প্রতিটি লঞ্চই অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে টার্মিনাল ছেড়ে যায়। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের চিত্র ছিল নাজুক। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করার অভিযোগ করেন যাত্রীরা। অবশ্য বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পরিবহন বিভাগের উপপরিচালক এহতেশামুল পারভেজ বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য যাত্রীদের সব সময় নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। তবুও যাত্রীরা পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। লঞ্চ কর্তৃপক্ষ বলছে, যাত্রীদের চাপ বেশি থাকায় বেশি যাত্রী উঠছে। এ জন্য তাদের আয় একটু বেশি হচ্ছে। তবে যাত্রীরা জানান, ঢাকা থেকে চাঁদপুরে ডেকের ভাড়া আগে ছিল ১২০ টাকা। এখন ২০০ টাকার বেশি নেওয়া হচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষ ৪০০ টাকাও নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা-ভোলা (ইলিশা) সিঙ্গেল কেবিনের আগের ভাড়া ছিল ৮০০ টাকা, ডাবল ভাড়া ১৬০০ টাকা। ঢাকা-বরিশাল (মুলাদী) ডেকের ভাড়া আগে ছিল ২২০ টাকা। এখন ৪০০ টাকা। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি ভাড়া নিচ্ছে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ। যাত্রীও নেওয়া হচ্ছে গাদাগাদি করে।

এ বিষয়ে যাত্রীরা বলেন, লঞ্চে চাপ বেশি হওয়ায় স্থান সংকট দেখা দিয়েছে। আমতলীর উদ্দেশে লঞ্চে ওঠা যাত্রী রমিজ আলী বলেন, সরকার লকডাউনের ঘোষণা দিয়েছে শনিবার। এবার শুনছি খুব কড়াকড়ি করবে। লকডাউনে ঢাকায় যাতে আটকে না পড়ি সে কারণে সময় থাকতে আজই বাড়ি চলে যাচ্ছি। চাঁদপুরগামী যাত্রী বাশার বিশ্বাস বলেন, সবাই একযোগে বাড়ি যাওয়ার কারণে লঞ্চে কেবিন পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ডেকে ও সিটে গাদাগাদি করেই যেতে হচ্ছে। সবাই সব কিছু জানলেও মানছে না কেউই।

সদরঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পাভেল মিয়া বলেন, যাত্রীদের ভিড় সামলাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেট এখানে কাজ করছেন। যারা স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না, তাদের জরিমানা করা হচ্ছে।

এদিকে লকডাউনকে কেন্দ্র করে গতকাল ঘরমুখো মানুষের চাপে রাজধানীর প্রায় প্রত্যেকটি সড়কেই তৈরি হয় তীব্র যানজট। রাইড শেয়ার থেকে ট্যাক্সি সার্ভিসে পরিণত হওয়া যানবাহনগুলোর ভাড়া স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর আগে সাধারণ যাত্রীদের পক্ষ থেকে জরুরি ট্যাক্সি সার্ভিস হিসেবে উবার চালু রাখার অনুরোধ থাকলেও সরকারি প্রজ্ঞাপনে তা উপেক্ষিত হয়। আজ সকাল ৬টা থেকে উবারসহ সব রাইড শেয়ার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

লকডাউনের কারণে আজ সোমবার থেকে অভ্যন্তরীণ সব রুটে বিমান চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।

শিবালয় (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, পাটুরিয়া ঘাটে যাত্রীদের গতকাল উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। পাটুরিয়া- দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরিস্বল্পতা ও যাত্রীবাহী বাসের চাপ বাড়ার কারণে ঘাটে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। পাটুরিয়া-ঢাকা মহাসড়কের আড়পাড়া পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার সড়কে যানজট ছড়িয়ে পড়ে। ঘরমুখো যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিআইডব্লিউটিসির আরিচা অফিসের ডিজিএম জিল্লুর রহমান জানান, ঘাট এলাকায় সকাল থেকে তীব্র যানজট দেখা দিয়েছে। ১৭টি ফেরির মধ্যে আমানত শাহ ফেরিসহ তিনটি ফেরি বিকল থাকায় ১৪টি দিয়ে যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে।

শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি জানান, শিবচরের বাংলাবাজার ঘাটে ঘরমুখো যাত্রীর ঢল দেখা গেছে। ফেরি ও লঞ্চে ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা তো দূরের কথা, অধিকাংশের মুখে মাস্কও ছিল না। পদ্মার দিকে তাকালে ঈদের আনন্দের চিত্র দেখা গেছে। যাত্রীদের চলাচল ছিল অনেকটাই বেপরোয়া। লোকাল বাসগুলোতে গাদাগাদি করে উঠতে দেখা গেছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীদের।

খুলনাগামী যাত্রী আবুবকর বলেন, লকডাউনে ঢাকায় বসে থেকে কোনো লাভ নেই। তাই বাড়ি যাচ্ছেন। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বনগ্রামের তারা মিয়া মুন্সি জানান, ছেলেমেয়েরা শুধু বাড়ি যেতে চায়। এ জন্য লকডাউনের সময়টা কাজে লাগাচ্ছেন।

বাংলাবাজার ঘাটের ট্রাফিক ইনচার্জ আক্তার হোসেন বলেন, সকাল থেকেই ঘরমুখো যাত্রীর ভিড় খুব বেশি। করোনা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে তাদের মাইকিং করে নিরাপদ দূরত্বে থাকার পরামর্শ দেওয়া হলেও অনেক যাত্রীই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না।

গ্রামেও ঝুঁকি বাড়বে: স্বাস্থ্যবিধি ভেঙে ঘরমুখো মানুষের এই ঢল প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ গতকাল সমকালকে বলেন, গত বছর সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর মানুষ যেভাবে গ্রামে ফিরেছিল, এবার লকডাউন ঘোষণার পরও একই চিত্র দেখা গেল। এ থেকে ধারণা করা যায়, ঘরমুখো মানুষের ভিড় সামলাতে সরকারের পরিকল্পনায় ঘাটতি ছিল। সংক্রমণ কমানোর লক্ষ্যে যে লকডাউন দেওয়া হলো, মানুষের গ্রামে ফিরে যাওয়ায় সেটা কতটুকু অর্জন করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হলো। গত বছর এভাবেই হাজার হাজার মানুষ গ্রামে গিয়েছিল। তখন গ্রামেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এবারও ঢাকা থেকে মানুষ ফেরায় সংক্রমণ কম থাকা গ্রামেও ঝুঁকি বাড়বে। তাহলে লকডাউন কেন দেওয়া হলো? মানুষকে নিজ নিজ স্থানে আটকে রাখা গেল না? আবার লকডাউন জারি করে অফিস-আদালত ও শিল্পকারখানা চালু রাখা হলো। তাহলে লকডাউন কীভাবে হলো? তা-ও মাত্র সাত দিনের লকডাউন। আসলে পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পনামাফিক হয়নি। করোনা নিয়ন্ত্রণে এই পদক্ষেপ কতটা কাজে আসবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।