আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

শরীয়তপুরে বোমা হামলা, গুলি ও অগ্নিসংযোগ করে ব্যালট ছিনতাই

news-image

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দুলুখন্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র কেন্দ্র দখল করেছে দুর্বৃত্তরা। দুই শতাধিক ককটেল বোমার বিস্ফোরণ ও গুলি ছুড়ে তারা কেন্দ্র দখল করে। দুর্বৃত্তরা ভোটকেন্দ্র থেকে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের ১ হাজারসহ মোট ৩ হাজার ব্যালট পেপার ও ৩টি ব্যালট বাক্স ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এর পর বাইরে থেকে দরজা আটকে ভোট কেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এ সময় নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা, আনসার সদস্য ও ভোটারেরা ওই কক্ষে আটকা পড়েন। ওই কক্ষকে লক্ষ্য করে ককটেল বোমার হামলা ও গুলি চালানো হয়। কেন্দ্রে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা পাল্টা গুলি ছুড়ে কেন্দ্র রক্ষার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে গুলি ফুরিয়ে গেলে আত্মরক্ষার জন্য পিছু হটে পুলিশ। এর পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মনদীব ঘড়াই নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা অবরুদ্ধদের উদ্ধার করেন। ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্কুল ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

এ সময় হামলাকারীরা অন্তত ৮ নারী আনসার সদস্য ও নারী ভোটারদের গয়না ছিনিয়ে নেয়। তবে দরজা ভেঙে সেখান থেকে তারা প্রাণে বাঁচে। এ সময় নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করা অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।

এ ছাড়া সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া যমুনা টেলিভিশনের স্টাফ করেসপনডেন্ট কাজী মনিরুজ্জামান ও দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকার জেলা সংবাদদাতা শরীফুল আলম ইমনের মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করা হয়। অন্যান্য গণমাধ্যম কর্মীরাও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এ ছাড়াও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা জাকারিয়া মাসুদের মোটরসাইকেলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তাৎক্ষণিক নির্বাচন স্থগিত করেন প্রিসাইডিং অফিসার।

অভিযোগ উঠেছে চেয়ারম্যান প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনের সমর্থরা এ হামলা করেছেন। দোলোয়ার হোসেন ব্যাপারী সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক ও নড়িয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইসমাইল হকের চাচাত ভাই

পুলিশ, নির্বাচন কর্মকর্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান—৫ম ধাপের ইউপি নির্বাচনে আজ ৫ ডিসেম্বর নড়িয়া উপজেলার ১৪ ও জাজিরা উপজেলার ১ ইউনিয়নে ভোট হয়। শুরু থেকেই প্রতিপক্ষের সমর্থকদের ওপর হামলা, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর ইউনিয়ন। ঘন কুয়াশা আর তীব্র শীত উপেক্ষা করে সকাল থেকেই প্রতিটি কেন্দ্রে উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হয় ভোটগ্রহণ। সকাল ১১টার দিকে দুর্বৃত্তরা ভোজেশ্বর ইউনিয়নের দুলুখন্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বেশ কিছু ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এরপর কঠোর নিরাপত্তায় ভোটগ্রহণ চললেও বেলা ২টার দিকে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এই কেন্দ্রের পরিবেশ।

সোয়া দুইটার দিকে কেন্দ্রের বাইরে থাকা শত শত বহিরাগত ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণ করে কেন্দ্র দখলে নেয়। হামলাকারীরা এ সময় নির্বাচনী কাজে ব্যবহৃত ৩ হাজার ব্যালট পেপার ও ৩টি ব্যালট বাক্স ছিনিয়ে নেয়। ঘটনার ছবি তুলতে গেলে গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর চড়াও হয় হামলাকারীরা। জীবন বাঁচাতে কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তার কক্ষে আশ্রয় নেন গণমাধ্যম কর্মীরা। এ সময় গণমাধ্যমকর্মীদের লক্ষ্য করে অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি ককটেল ও গুলি ছোড়ে হামলাকারীরা। এ সময় সাংবাদিকেরা দীর্ঘ সময় ওই কক্ষে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকেন। খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে গুলি বর্ষণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

হামলার শিকার যমুনা টেলিভিশনের সাংবাদিক কাজী মনিরুজ্জামান বলেন, বোমা ফাটিয়ে সকাল থেকেই বহিরাগতরা আতঙ্ক সৃষ্টি করে। দুপুরে কেন্দ্রে বোমা ফাটিয়ে ও গুলি করে কেন্দ্র দখলে নেয় হামলাকারীরা। এ সময় আমাদের টার্গেট করে ককটেল ও গুলি ছোড়ে তারা। কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়ে কোনো রকমের জীবন রক্ষা করেছি। চোখের সামনে আমার মোটরসাইকেলসহ মোট তিনটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

নারী আনসার সদস্য তরিকত নেছা বলেন, বোমা ও গুলির তোপে কেন্দ্রের ভেতর আশ্রয় নেই। পরে ভোট বাক্স, ব্যালট ছিনিয়ে নেওয়ার পর স্কুল ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের মারধর করে গায়ের গয়না ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।

৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য প্রার্থী ইকবাল সিকদার বলেন, হামলার সময় কেন্দ্রের মধ্যে আটকা পরি। বাহির থেকে কক্ষ আটকে দিয়ে আগুন লাগিয়ে দিলে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। জানালা ভেঙে ভবন থেকে বাইরে এসে প্রাণে বাঁচি।

চেয়ারম্যান প্রার্থী শহীদুল ইসলাম সিকদার বলেন, দেলোয়ার হোসেন ব্যাপারীর সমর্থকেরা ভোট বানচাল করার জন্য তিনটি কেন্দ্রে হামলা চালায়। সকাল থেকে ককটেল হামলা করে আতঙ্ক ছড়ায়। দুপুরের দিকে ৫ নম্বর ওয়ার্ড কেন্দ্রে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চেয়ারম্যান প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন ব্যাপারীকে ফোন দিলে বন্ধ পাওয়া যায়। তাই তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দুলুখন্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার আব্দুল ওয়াদুদ জানান, দুপুর সোয়া দুইটার দিকে বহিরাগতরা বোমাসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কেন্দ্রে হামলা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলি ছোড়ে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশের গুলি ফুরিয়ে গেলে হামলাকারীরা কেন্দ্রে প্রবেশ করে কর্মকর্তাদের মারধর করে ব্যালট পেপার ও বাক্স ছিনিয়ে নেয়। পরে তারা কেন্দ্রে আগুন লাগিয়ে দেয়। তাৎক্ষণিক এই কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করেছি।

শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার এস এম আশরাফুজ্জামান কে বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। ভোটকেন্দ্রে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।