আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

সীমাহীন ভোগান্তি উপেক্ষা করে ঢাকায় ফেরা

news-image

ঈদের চতুর্থ দিনেও ঢাকায় ফেরার ভোগান্তির অবসান হয়নি। গণপরিবহন না থাকায় গ্রাম থেকে ফিরতে তাদের সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। সোমবার নগরীর বিভিন্ন স্থ’ানে গ্রাম থেকে ফেরা যাত্রীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, গণপরিবহন না থাকায় একদিকে যেমন কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে তেমনি ব্যয়ও বাড়ছে। জীবিকার টানেই মানুষ বিকল্প উপায়ে সড়ক, নৌ ও আকাশপথে ঢাকায় ফিরছে। ফলে বিমানবন্দর থেকে শুরু করে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া, শিমুলিয়া, দৌলতদিয়া ও পাটুরিয়া ঘাটে প্রচ- ভিড় জমে। চলতি সপ্তাহ জুড়েই মানুষ গ্রাম থেকে ঢাকায় আসতে থাকবে বলে জানিয়েছে পরিবহন ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে গণপরিবহন চালুর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। অন্যদিকে বিক্ষিপ্তভাবে চলাচলকারী গণপরিবহন থামিয়ে দিয়েছে পুলিশ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সোমবারও যাত্রীদের গন্তব্যে যেতে হচ্ছে ভেঙ্গে ভেঙ্গে। সিএনজি, অটোরিক্সা, মোটরসাইকেলে তারা ঢাকায় ফিরছেন। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। সজিব নামের এক যাত্রী বলেন, ঈদ শেষে কাজে তো ফিরতেই হবে। করোনার ভয় করলে জীবন চলবে না। সাবিনা বলেন- একটি এনজিওতে কাজ করি। ছুটি শেষে এখন ফিরতে হবে। গণপরিবহন না থাকায় বিকল্প উপায়ে বাড়তি ভাড়া দিয়ে যেতে হবে গন্তব্যে।

শিমুলিয়ায় কঠিন ভিড় ॥ ঈদ শেষে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুট দিয়ে কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছে দক্ষিণবঙ্গের মানুষ। এতে প্রতিটি ফেরিতে রয়েছে মানুষের উপচেপড়া ভিড়। সোমবার সকাল থেকে বাংলাবাজার থেকে শিমুলিয়াঘাটে আসা প্রতিটি ফেরিতে কর্মস্থলমুখী যাত্রীদের ভিড় দেখা যায়। একই সঙ্গে এসব ফেরিতে জরুরী, যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী যানবাহন পার হচ্ছে।

এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ থেকে সংবাদদাতা জানান- লৌহজং উপজেলার মাওয়া সংলগ্ন শিমুলিয়াঘাটে ঢাকাগামী যাত্রীদের ভিড় বেড়েছে। ১৭ মে সোমবার সকাল ১০টার পর থেকে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। প্রচ- গরম, মাথার ওপর খা খা করছে সূর্য, যাত্রীদের অত্যধিক চাপের মধ্যেই কয়েক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে ব্যাগেজ, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কর্মস্থলে ফিরছে মানুষ। ঈদ-উল-ফিতরের ছুটি শেষে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম ব্যস্ত প্রবেশপথ শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে ঢাকামুখী যাত্রীদের চাপ বেড়েছে। সরকারী, বেসরকারী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা কাজে যোগদানের লক্ষ্যে পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটছেন কর্মস্থলের দিকে। আবার ঈদ উপলক্ষে যারা গ্রামে যাননি তাড়াও গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়াঘাটে আসছেন। মানুষের যাওয়া-আসায় কর্মব্যস্ত শিমুলিয়া ফেরিঘাট। ঢাকাগামী যাত্রীদের অভিযোগ, শিমুলিয়াঘাটে আসার পর পরিবহন সঙ্কটে পড়তে হচ্ছে তাদের। মোটরসাইকেল, সিএনজি-চালিত অটোরিক্সা, পিকআপ ভ্যান, অটোরিক্সাই ঢাকায় যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম। আর সেই সুযোগে চালকরা কয়েকগুণ বেশি ভাড়া আদায় করছেন।

শিমুলিয়াঘাট সূত্রে জানা যায়, করোনা মহামারীর কারণে চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় শিমুলিয়াঘাট থেকে লঞ্চ, স্পিডবোট ও ট্রলার চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ কারণে যাত্রীদের চাপ বেড়েছে ফেরিগুলোয়। যাত্রীদের চাপে এই নৌপথে চলাচল করছে ১৮টি ফেরি। ফেরি থেকে নামার পরে তিন থেকে চারগুণ বাড়তি ভাড়া দিয়ে বিভিন্ন যানবাহনে নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটছেন যাত্রীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। মাওয়া ট্রাফিক পুলিশ ইন্সপেক্টর মোঃ হাফিজুল ইসলাম জানান, এ নৌপথে ১৮টি ফেরি চলাচল করছে। ঈদে যে সংখ্যক মানুষ বাড়ি গিয়েছিলেন সেই তুলনায় স্বাভাবিকভাবে তারা ঢাকায় ফিরছেন। শিমুলিয়াঘাট থেকেও যাত্রীরা বাংলাবাজারঘাটে যাচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, যানবাহনের চাপ নেই। যেসব গাড়ি আসছে সেগুলো সরাসরি ফেরিতে যেতে পারছে। কয়েকটি খালি ফেরিও পাঠানো হয়েছিল শুধু যাত্রীদের আনার জন্য।

দৌলতদিয়ায়ও চাপ॥ রাজবাড়ি থেকে সংবাদদাতা জানান- ঈদ করে ঢাকায় ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে ছুটছে মানুষ। ছুটি কাটিয়ে কর্মমুখী হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এতে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীদের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। মহাসড়কে গণপরিবহন না থাকায় অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে কর্মমুখী মানুষের। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট ছোট যানবাহনে যাচ্ছে যাত্রীরা।সোমবার দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকা ঘুরে দেখা যায় এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দক্ষিণ-পশ্চিমঞ্চলের ২১ জেলার রাজধানীর প্রধান প্রবেশপথ দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট। তবে কঠোর লকডাউন অপেক্ষা করে ঈদে ছুটিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘরমুখী হয়েছে অনেকে। এখন আবার একইভাবে কর্মমুখী হচ্ছে এসকল মানুষ। এতে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। চাপ রয়েছে প্রাইভেটকার ও মাক্রোবাসের। এদিকে মহাসড়কে গণপরিবহন না থাকায় ছোট ছোট যানবাহনে ভেঙ্গে ভেঙ্গে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে কর্মমুখী মানুষের। এসময় রাস্তায় অতিরিক্ত টাকা ব্যয় হচ্ছে এদের। কর্মমুখী দিলরুবা নামের এক যাত্রী বলেন, ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসেছিলাম। ছুটি শেষে আবারও কর্মমুখী। তবে, মহাসড়কে গণপরিবহন না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে দুর্ভোগের শেষ নেই। এসময় অতিরিক্ত টাকাও খরচ হচ্ছে। তিনি দুঃখ করে বলেন, গণপরিবহন না থাকায় রাস্তায় বা গাড়িতে কোন প্রকার সামাজিক দূরত্ব বজাই রাখতে পারছে না কেউ। বরং গাদাগাদি করে যেতে হচ্ছে। হবিবুর রহমান নামের এক যাত্রী বলেন, সকল কিছু স্বাভাবিক রয়েছে শুধু লঞ্চ ও গণপরিবহন ছাড়া। তিনি বলেন, এসময় গণপরিবহন থাকলে যাত্রীরা সহজে গন্তব্যে যেতে পারত।

বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়াঘাট অফিস সূত্রে জানা যায়, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে বর্তমান ৯টি রোরো (বড়) ফেরি এবং ৬টি ইউটিলিটি (ছোট) ফেরি চলাচল করছে। দৌলতদিয়া পারে ৭টি ঘাটের মধ্যে বর্তমান ৩টি ফেি ঘাট সচল রয়েছে। দৌলতদিয়াঘাট শাখার ব্যবস্থাপক মোঃ ফিরোজ শেখ জানান, দৌলতদিয়াঘাটে যাত্রী ও যানবাহন নদী পারাপার করার জন্য সর্বক্ষণিক ছোট-বড় ১৫টি ফেরি রয়েছে। তবে গণপরিবহন না থাকায় ফেরি ঘাটে কোন প্রকার সমস্যা হচ্ছে না।

গণপরিবহন চালুর দাবি॥ এদিকে কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীদের পথে পথে ভোগান্তি, ভাড়া নৈরাজ্য ও গাদাগাদি করে যাতায়াতের স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমাতে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ সাপেক্ষে গণপরিবহন চালুর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ দাবি জানিয়েছেন সংগঠনের মহাসচিব মোঃ মোজাম্মেল হক চৌধুরী। বিবৃতিতে বলা হয়, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে একদিকে সরকার ঘোষিত লকডাউনে দূরপাল্লার বাস সার্ভিস বন্ধ। অন্যদিকে ঈদের ছুটিতে রাজধানীতে হোটেল, রেস্তরাঁ ও পয়ঃশৌচাগারসহ মানুষের মৌলিক চাহিদার উপাদানগুলো বন্ধ। এছাড়া অবর্ণনীয় দুর্ভোগ মাথায় নিয়ে প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, ট্রাক-পিকআপে গাদাগাদি করে, কেউবা শত শত মাইল হেঁটে, ফেরিতে গাদাগাদি করে পার হয়ে, অতিরিক্ত ভাড়া নৈরাজ্যের শিকার হয়ে ঈদে বাড়ি পৌঁছানোর চিত্র আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। আবার ঈদ শেষে একই পন্থায় সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে গাদাগাদি করে তারা কর্মস্থলে ফিরছে। এহেন পরিস্থিতিতে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন সাপেক্ষে জরুরী ভিত্তিতে আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার নন-এসি বাস সার্ভিস চালু করা হলে যাত্রীদের ভোগান্তি কমানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমবে।

গণপরিবহনের ওপর চটেছে প্রশাসন॥ এদিকে হঠাৎ গণপরিবহনের ওপর বেজায় চটেছে পুলিশ প্রশাসন। ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরার পথে দূরপাল্লার বাসের বিরুদ্ধে রবিবারও পুলিশ ছিল অনেকটা ঢিলেঢালা। এদিন বিভিন্ন জেলা থেকে গণপরিবহন অহরহ চলাচল করতে দেখা গেছে। তবে সোমবার থেকে কঠোরভাবে মাঠে নেমেছে প্রশাসন। সরকারী নিষেধাজ্ঞা অমান্য ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগে গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা, কোনাবাড়ি, মৌচাক, সফিপুরসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে দূরপাল্লার ৯৭টি বাসের চালক-মালিকের বিরুদ্ধে মামলা ও ১০ গাড়ি ডাম্পিং করেছে পুলিশ। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার ট্রাফিক (উত্তর) মোঃ মেহেদী হাসান জানান, ঈদের ছুটি শেষে গাজীপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া লোকজন কর্মস্থলে ফিরছেন। সরকারী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কিছু বাস ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলাচল করছিল। রবিবার বিকাল থেকে সোমবার দুপুর পর্যন্ত গাজীপুর মহানগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে এ ধরনের ৪৫টি বাসের চালক-মালিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এছাড়া রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগে আরও ১০ গাড়ি ড্যাম্পিং করা হয়। গাজীপুর মহানগরীর সালনা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর গোলাম ফারুক জানান, সরকারী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কালিয়াকৈর চন্দ্রা ও কোনাবাড়ি এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দূরপাল্লার ৪৬ বাসের চালক-মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। চার গাড়ি আটক করা হয়েছে। মাওনা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ কামাল হোসেন জানান, শ্রীপুর উপজেলার মাওনা- চৌরাস্তায় রবিবার সন্ধ্যায় দূরপাল্লার বাস যাত্রী নিয়ে চলাচলের চেষ্টা করলে ছয় বাসচালকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক সার্জেন্ট জানান, কিছু বাসমালিক ও চালক সরকারী নির্দেশ অমান্য করে ঈদের আগের দুই দিন ও ঈদের পরের দিন দূরপাল্লার যানবাহন চালিয়েছে। আমরাও কিছুটা নমনীয় ছিলাম। বিভিন্ন মিডিয়াতেও দূরপাল্লার যানবাহন চলাচলের খবর প্রচারিত হচ্ছিল। এখন দেখছি পুলিশের নমনীয়তাকে পরিবহন মালিক ও চালকরা দুর্বলতা ভেবেছে। সে জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করে যারা দূরপাল্লার বাস চালানোর চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পুলিশের এ অভিযান চলবে আরও জোরে।