আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

সোহেল রানার শত কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে চাঞ্চল্য

news-image

ই-অরেঞ্জের গ্রাহকের বিপুল অর্থ আত্মসাতের মামলার পর পালিয়ে গিয়ে ভারতে গ্রেফতার হওয়া বনানী থানার পরিদর্শক (বরখাস্ত) সোহেল রানার শত শত কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডারের এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তার এত সম্পদের উৎস কী তা নিয়ে চলছে সরগরম আলোচনা। অভিযোগ উঠেছে, ই-অরেঞ্জের পৃষ্ঠপোষক সোহেল রানা দেশে-বিদেশে নামে-বেনামে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। শত শত কোটি টাকা পাচার করেছেন থাইল্যান্ডসহ একাধিক দেশে। তবে এত অর্থ-সম্পদ তার কীভাবে হলো এবং প্রকৃতই তার বৈধ বা অবৈধ সম্পদের পরিমাণ কত তা জানতে মাঠে নেমেছে খোদ পুলিশ বিভাগসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মো. আসাদুজ্জামান গতকাল বলেন, ‘সোহেল রানার বিপুল অর্থ-সম্পদের বিষয়গুলো গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে আমরাও জেনেছি। সবকিছু সামনে রেখে পুলিশের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সোহেল রানাকে সাময়িক বরখাস্ত করার পর বিভাগীয় তদন্ত চলছে। এই বিভাগীয় তদন্তের পাশাপাশি সোহেল রানার অবৈধ অর্থ-সম্পদের বিষয়েও কাজ চলছে।’

সোহেল রানার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক (জনসংযোগ) মোহাম্মদ আরিফ সাদেক সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমরা নিজ থেকে এখনও সোহেল রানার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে কাজ শুরু করিনি। ই-অরেঞ্জের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের মামলার নথিপত্র পেলে সোহেল রানার অর্থ-সম্পদের বিস্তারিত অনুসন্ধান করবে দুদক।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সদ্য বরখাস্তকৃত পুলিশ কর্মকর্তা সোহেল রানার বিপুল অবৈধ সম্পদ এবং ই-অরেঞ্জের মাধ্যমে গ্রাহকের বিপুল অর্থ আত্মসাতের মামলার পর বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন পুলিশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তারা। সোমবারও পুলিশ সদর দফতর ও ডিএমপি সদর দফতরে এসব বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে। সোহেল রানা ছাড়াও পুলিশে কর্মরত বিভিন্ন অভিযোগ ওঠা কর্মকর্তা বা সদস্যদের বিষয়েও তদন্ত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

জানা গেছে, ঢাকার অভিজাত গুলশানে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন সোহেল রানা। তবে গুলশান ও নিকেতনে তার ফ্ল্যাট থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ই-কমার্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জ প্রতিষ্ঠা করে নেপথ্যে থেকে গ্রাহকদের বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সোহেল রানা। পাশাপাশি গুলশান ও বনানী থানায় কর্মকালে পুলিশের প্রভাব খাটিয়েও অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ টাকা কামিয়েছেন। যে পরিমাণ অর্থ-সম্পদের অভিযোগ উঠেছে তাতে একজন পুলিশ পরিদর্শক তো দূরের কথা, অনেক ঊর্ধ্বতন পদে সরকারি চাকরি করে সারাজীবনেও এত অর্থ-সম্পদের মালিক হওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। অবৈধ উপায়ে এসব অর্থ-সম্পদ আয় করলেও এতদিনে পুলিশ বিভাগ বা কোনো সংস্থা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কেন তাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। তারপরও পুলিশের আইজি ড. বেনজীর আহমেদ রোববার সাংবাদিকদের বলেছেন, পুলিশ সদস্যদের অপরাধ প্রমাণ হলেই কেবল বিভাগীয় ব্যবস্থা নয়, চাকরিচ্যুতির পাশাপাশি ফৌজদারি মামলাও করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে বলা হচ্ছে, সোহেল রানা নিজ নামে বা আত্মীয়স্বজনদের নামে দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত ই-অরেঞ্জের দুটি ব্যাংক হিসাব থেকে অন্তত ৩৪৯ কোটি টাকা সরিয়ে ফেলা হয়েছে বা বেহাত হয়েছে। ই-অরেঞ্জ থেকে সরিয়ে সোহেল রানা এসব অর্থ দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্নিষ্টরা। থাইল্যান্ডের পাতায়ায় নির্মাণাধীন একটি পাঁচতারকা হোটেলে শতকোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন তিনি। দেশের অভ্যন্তরে একইভাবে একাধিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ রয়েছে। পর্তুগালে সুপারশপ, রেস্টুরেন্ট ও মদের বার রয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার রাতে বনানী থানায় দায়িত্ব পালন শেষে দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে যান সোহেল রানা। কয়েক ঘণ্টার মাথায় শুক্রবার ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারের চ্যাংড়াবান্ধা সীমান্ত থেকে সোহেল রানাকে আটক করে। ই-অরেঞ্জ নামে অনলাইন প্লাটফর্মের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে গ্রাহকের বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠা সোহেল রানা, তার বোন-ভগ্নিপতিসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই দুটি মামলাও হয়েছে।