আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

হাটহাজারীতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত ৪ ♦ বায়তুল মোকাররম এলাকায় সংঘর্ষ ♦ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আরেকজনের প্রাণহানি

news-image

রাজধানীর বায়তুল মোকাররম এলাকায় গতকাল পুলিশের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এরপর চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে থানা ও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের হামলার পর সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাণ্ডব চালিয়ে রেলওয়ে স্টেশন, জেলা পরিষদ ভবন, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারের বাসভবন, বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর করা হয়েছে। এ ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ওপর দিয়ে যাওয়া সব রেলপথ বন্ধ হয়ে আছে। গতকাল শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। এই প্রতিবেদন লেখার সময় রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত রেল যোগাযোগ অচল অবস্থায় ছিল। গতকাল সন্ধ্যা থেকে দেশে ফেসবুকও বন্ধ হয়ে যায়।

এদিকে আজ শনিবার সারা দেশে বিক্ষোভ এবং আগামীকাল রবিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ঘোষণা দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। গত রাতে পুরানা পল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আবদুর রব ইউসুফী এই ঘোষণা দেন। নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও চট্টগ্রাম এবং হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন বিস্তারিত।

হাটহাজারীতে সংঘর্ষে নিহত ৪ : হাটহাজারীর বড় মাদরাসা হিসেবে পরিচিত দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম থেকে গতকাল দুপুরে জুমার নামাজের পর হেফাজতে ইসলামের কয়েক হাজার কর্মী লাঠিসোঁটা নিয়ে বিভিন্ন স্থানে হামলা চালান। হাটহাজারী থানা, ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও ডাকবাংলোতে হামলা চলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি ছুড়লে চারজন নিহত হন। এর মধ্যে তিনজন হাটহাজারীর দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদরাসার শিক্ষার্থী ও একজন পথচারী।

নিহতরা হলেন ওই মাদরাসার মাস্টার্সের (দাওরায়ে হাদিস) শিক্ষার্থী কাজী মিরাজুল ইসলাম, রবিউল ইসলাম ও জামিল এবং পথচারী মো. মিজান। নিহত মিজান স্থানীয় একটি দরজি দোকানে কাজ করতেন। এ ছাড়া চারজন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের পরিচয় জানা যায়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হাটহাজারী থানার ওসি রফিকুল ইসলাম।

হেফাজতে ইসলামের প্রচার সম্পাদক জাকারিয়া নোমান ফয়েজী জানান, বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের ওপর ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পরে পুলিশের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে মাদরাসার তিনজন এবং একজন পথচারী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আরো বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) জহিরুল ইসলাম ভুঁইয়া জানান, হাটহাজারী থেকে গুলিবিদ্ধ চারজনের মরদেহ হাসপাতালে আনা হয়েছে। মরদেহগুলো মর্গে পাঠানো হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাণ্ডবের সময় আশেক (২৫) নামের এক যুবক মারা গেছেন। তিনি পৌর এলাকার দাতিয়ারার সাগর মিয়ার ছেলে। তবে আশেক কিভাবে মারা গেছেন সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জানা গেছে, বিকেলে কাউতলী এলাকায় আঘাতপ্রাপ্ত হন আশেক। জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

ওই সময়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে থাকা চিকিৎসক মো. আরিফুজ্জামান জানান, ওই যুবকের শরীরের ডান পাশে আঘাতের চিহ্ন আছে। মৃত্যুর পর কিছু লোকজন এসে লাশ নিয়ে যায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনে হামলার ঘটনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। সন্ধ্যা সোয়া ৭টা নাগাদ ঢাকাগামী আন্ত নগর মহানগর গোধূলি, মহানগর এক্সপ্রেস, কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, নোয়াখালীগামী উপকূল এক্সপ্রেস পূর্বাঞ্চল রেলপথের বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে।

গতকাল দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রেলওয়ে স্টেশন, জেলা পরিষদ ভবন, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারের বাসভবন, বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর করা হয়। এ ছাড়া পৌর এলাকার ভাদুঘর থেকে কুমারশীল মোড় পর্যন্ত সড়কে আগুন ধরিয়ে অবরোধ করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনের প্যানেল বোর্ড পুড়িয়ে দেওয়া হয়। অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দুটি গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। আগুন লাগানো হয় সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সামনেও।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার শাহাদত আলী বলেন, ‘শুধু ঢাকার সঙ্গে সিলেট আর চট্টগ্রামের রেল যোগাযোগ বন্ধ। এই দুই রুটেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ওপর দিয়ে যেতে হয়। বাকি সব ঠিক আছে। আশা করি, দ্রুতই পুলিশের কাছ থেকে ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যাবে।’

রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ট্রেন চলাচলের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। লাইন পরীক্ষার জন্য রাত সাড়ে ১০টার দিকে আখাউড়া থেকে লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) ছেড়ে যায়। সিলেটের স্টেশন মাস্টার মো. খলিলুর রহমান বলেন, রাত ১০টা ১৫ মিনিটে সিলেট থেকে যে ট্রেন ছেড়ে যাওযার কথা ছিল সেটা ছেড়ে গেছে। সাড়ে ১১টার ট্রেনও সঠিক সময়ে ছাড়া হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল-মামুন সরকার স্বাধীনতা দিবসের এই দিনে এমন হামলাকে পূর্বপরিকল্পিত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা উদ্দেশ্যমূলক। কোনো ধরনের কারণ ছাড়াই জেলা শহরের বিভিন্ন স্থানে তাণ্ডব চালানো হয়েছে। আমরা এ ঘটনার নিন্দা জানাই। পাশাপাশি বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি।’

ফেসবুক বন্ধ : এদিকে গতকাল সন্ধ্যা থেকে সারা দেশে ফেসবুক বন্ধ হয়ে যায়। ফেসবুক মেসেঞ্জারও অকার্যকর থাকে। তার আগে মোবাইল ফোন অপারেটর সূত্র জানায়, ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদসহ কিছু এলাকা এবং চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকায় দ্রুতগতির মোবাইল ইন্টারনেট সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) থেকে মোবাইল অপারেটরগুলোকে এ বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়।

রাত ৮টার দিকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘ঢাকার বায়তুল মোকাররম, চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পরিস্থিতি নিয়ে ফেসবুক লাইভে অপপ্রচার বন্ধ করার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জেনেছি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সে সক্ষমতা রয়েছে। আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে কোনো কিছু করা হয়নি।’

রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায় গতকাল জুমার নামাজ শেষে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মুসল্লিদের একটি অংশ প্রথমে মসজিদের উত্তর গেটে জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকে। পরে হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা মিছিল নিয়ে পুরানা পল্টন মোড়ের দিকে যেতে চাইলে পুলিশ তাঁদের বাধা দেয়। এ সময় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরাও মিছিলকারীদের ধাওয়া দেন। এক পর্যায়ে ধাওয়াধাওয়িতে সেখানে ত্রিমুখী সংঘর্ষ বেধে যায়। পরে মিছিলকারীরা পিছু হটে মসজিদের ভেতরে ঢুকে পড়ে। কিছুক্ষণ পর আবারও হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা সংগঠিত হয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং ফাঁকা গুলি ছোড়ে। সাউন্ড গ্রেনেডও ব্যবহার করা হয়। এতে সাধারণ পথচারী ও মুসল্লিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সড়কের পাশে থাকা তিনটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করেন হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা। বিকেল ৩টা পর্যন্ত উভয় পক্ষে ধাওয়াধাওয়ি ও সংঘর্ষ চলে। এ সময় সাংবাদিক, পুলিশসহ হেফাজতে ইসলাম, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের ৫৫ জন নেতাকর্মী আহত হন।

রাজধানীতে সংঘর্ষে যাঁরা আহত : বায়তুল মোকাররম এলাকায় আহতদের মধ্যে অন্তত ৪০ জন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং অন্যান্য হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁরা হলেন একাত্তর টিভির সাংবাদিক ইশতিয়াক ইমন (৩০), বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ডটকমের রিপোর্টার মিরাজ হোসেন ইফতি, প্রথম আলোর ফটোগ্রাফার হাসান রাজা, ডেইলি স্টারের ফটো সাংবাদিক আমরান হোসেন ও প্রবীর দাশ। আহতদের মধ্যে অন্যরা হলেন টুটুল (৩৯), দিদার (৪০), আরিফ (৩২), আজিজ (৪০), তারেক (২৫), শাকিল (৪৫), মুরাদ (৩৫), সোহেল (৩০), নজরুল ইসলাম (৪৬), চঞ্চল (৩৪), খায়রুল (৩৬), রিয়াদ (৩৫), আরিফ (৪৫), ইমন (৩২), জীবন (৪০), কলিমুল্লাহ (৩০), মাইদুল (২৯), গাজী মাজারুল (৫০), রুবেল মাতব্বর (৩১), ইমন খান (৩৮), সোহেল (২৩), লিমন (৩৮), আসাদুল (৩০), নিয়ামুল ইসলাম (২৩), সোহেল (২৯), আনোয়ার হোসেন (৪২), দুলাল হোসেন (৪০), মনির (২৪) এবং অজ্ঞাতপরিচয় একজন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন হোসেন আহামেদ মিঠু (৩৪)।

এ জাতীয় আরও খবর

বিশ্বে করোনায় মৃত্যু-শনাক্ত কমেছে

ফুঁসছে ঘূর্ণিঝড় গুলাব, আতঙ্কে উপকূলবাসী

শেখ হাসিনা শিশু পার্কের পরীক্ষামূলক যাত্রা শুরু

দুর্নীতি দমনে পিছু হটব না : বিআরটিসির চেয়ারম্যান

আপত্তিকর ভিডিও, মামলা না নেওয়ায় আত্মহত্যার হুমকি স্কুলছাত্রীর

হবিগঞ্জে দখল-দূষণে হুমকির মুখে নদ-নদী

বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় ‘গুলাব’, দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টির শঙ্কা

সিংগাইরে এক দিনে পৃথক স্থান থেকে ২ জনের লাশ উদ্ধার

কুয়েতে প্রবাসী সংবাদকর্মীদের ফুটবল টিম গঠন

২০০ কোটি টাকার প্রতারণা মামলায় আবারও তলব জ্যাকলিনকে

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিসহ ৪৫ অভিবাসী ১৪ দিনের রিমান্ডে

নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরী রানীর বাড়িতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত