আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

২৪টি খাল ভরাট করে স্থাপনা, বৃষ্টি হলেই ডোবে বরিশাল

news-image

ভেঙে পড়েছে বরিশাল নগরীর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা। ২৪টি খাল ভরাট করে স্থাপনা, ড্রেন নির্মাণ এবং কীর্তনখোলা নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যায় নগরী। জলাবদ্ধতা নিরসনে নগরীর ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার, নদীতে ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা এবং খালে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার কথা বলেছেন সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ।

নগরবাসীর অভিযোগ, বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা দেখলেও নিরসনের ব্যবস্থা নিচ্ছে না সিটি করপোরেশন। নগরবাসীর দুর্ভোগে হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন সংশ্লিষ্টরা। মাঝেমধ্যে কিছু ড্রেনের ময়লা তুলে ফটোসেশনে সীমাবদ্ধ তাদের কর্মকাণ্ড।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল নগরীঘেঁষে বয়ে গেছে ২৪টি খাল। সময়ের ব্যবধানে সবগুলো খাল ভরাট হয়ে গেছে। ২০০২ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) গঠিত হয়। ২০০৩-২০০৮ সাল পর্যন্ত মেয়র ছিলেন মজিবুর রহমান সারওয়ার। তার সময়ে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২০০৮-২০১৩ সাল পর্যন্ত মেয়রের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রয়াত শওকত হোসেন হিরন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর নগরীতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়। ওই সময় নগরীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত খাল ভরাট করে ড্রেন নির্মাণ করা হয়। প্রায় ২০০ কিলোমিটার এলাকায় রয়েছে ড্রেন। তা পরিকল্পিতভাবে নির্মিত হয়নি। ড্রেনের তলদেশে থাকা সিমেন্ট এখন আর নেই। তবে খাল ভরাট করে ড্রেন নির্মাণ ছিল আত্মঘাতী।

হিরনের শেষ সময়ে ড্রেন পরিষ্কার করতে গিয়ে তলদেশে সিমেন্ট না পাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ার পর কিছু ময়লা রেখে পরিষ্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়। তখন ড্রেনের নিচে ময়লার স্তর ছিল বলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা দাবি করেছেন। এ ছাড়া আগে খাল ছিল পাঁচ ফুট চওড়া। কিন্তুু ড্রেন সংকীর্ণ হওয়ায় পানি সরতে পারে না। এরপর যারাই দায়িত্বে এসেছেন ড্রেন পরিষ্কার করে পানিপ্রবাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করেছেন মাত্র। তা যথাযথ না হওয়ায় অল্প বৃষ্টি এবং কীর্তনখোলা নদীর জোয়ারের পানিতে ডুবে যায় নগরী।

জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আহসান হাবিব কামাল মেয়র ছিলেন ২০১৩-২০১৮ সাল পর্যন্ত। তিনিও নগরীর জলাবদ্ধতা দূর করতে পারেননি। ড্রেন ও খাল পরিষ্কার করে জলাবদ্ধতা নিরসনের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। তখনও নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

এর ব্যত্যয় ঘটেনি বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর সময়েও। ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার প্রধান কাজ ছিল জলাবদ্ধতা নিরসন। এ জন্য ড্রেনের তলদেশ থেকে ময়লা উত্তোলন করা হয়। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসন হয়নি। সামান্য বৃষ্টি হলেই ডুবে যায় নগরী। এর মধ্যে কয়েকটি এলাকা হাঁটুপানিতে তলিয়ে যায়।

নগরীর বাসিন্দারা জানিয়েছেন, খাল ভরাট করে ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। ড্রেনের ওপর ফুটপাত বসানো হয়েছে। নির্মাণের কাজ হওয়ায় ফুটপাত ভেঙে ড্রেন ভরাট হয়ে যায়। এ ছাড়া যেসব স্থানে ড্রেনের ময়লা সরানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তার বেশির ভাগের ঢাকনা নেই। এ জন্য ওসব স্থানে যে যার মতো ময়লা-আবর্জনা ফেলায় ড্রেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, বিসিসি’র অধীন নগরীতে এক তৃতীয়াংশ ড্রেনেজ ব্যবস্থা রয়েছে। তা আবার সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার আওতায় নেই। এ ছাড়া ড্রেনের লেয়ার ঠিক নেই। ফলে বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতে সড়ক চলে যায় পানির নিচে। এ জন্য সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। যাতে এক ড্রেনের পানি অপর ড্রেনে যেতে পারে। একই সঙ্গে ড্রেনের লেয়ার ঠিক করতে হবে।

পরিবেশবাদী সংগঠন সবুজ আন্দোলনের জেলা সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান বলেন, বিসিসি পরিকল্পনা করে ড্রেন নির্মাণ করেনি। ড্রেন নির্মিত হয়েছে নগরবাসীকে দেখানোর জন্য। ড্রেন ঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। এ জন্য প্রতিনিয়ত ময়লা আটকে যায়। সিটি করপোরেশনকে আমরা কর দিই। তাদের কাজ ড্রেন পরিষ্কার করে পানিপ্রবাহ ঠিক রাখা। জলাবদ্ধতা নিরসনে পরিকল্পনা অনুযায়ী ড্রেনেজ করলে সমস্যার সমাধান সম্ভব।

নদী-খাল বাঁচাও আন্দোলনের জেলা সদস্য সচিব কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু বলেন, নগরীর সবচেয়ে বড় খাল সাগরদী। খালটি মালামাল পরিবহন থেকে শুরু করে শহরের বড় একটি এলাকার পানি নিষ্কাশনে প্রধান ভূমিকা রেখে আসছিল। বটতলা বাজার এলাকা থেকে খালের ওপর ড্রেন করে বহুতল মার্কেট করেছে জেলা পরিষদ। চৌমাথা থেকে বটতলা বাজার পর্যন্ত খাল ভরাট করে সড়ক প্রশস্ত ও সরু ড্রেনের ওপর ফুটপাট করেছে সিটি করপোরেশন। এভাবে ২৪টি খাল ভরাট করে ড্রেন নির্মাণ করায় জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে পড়েছে নগরবাসী। পাশাপাশি প্রতিনিয়ত পলি জমে কীর্তনখোলা নদীর তলদেশ উঁচু হওয়ায় নগরীতে ঢুকছে জোয়ারের পানি। এ জন্য কীর্তনখোলা ড্রেজিং করা জরুরি।

বিসিসি’র প্রথম মেয়র বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, মেয়র হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসীকে রক্ষার চেষ্টা করি। এ জন্য বরাদ্দ চেয়েও পাইনি। পরে জনগনকে নিয়ে খাল পরিষ্কার করে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করি।

মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর ড্রেন পরিষ্কার করে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা হয়। এ জন্য কোনও বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বিসিসি’র নিজস্ব আয় থেকে এ কাজ চালানো হচ্ছে।

বরিশাল বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কীর্তনখোলা নদীর নাব্যতা সংকট রয়েছে। পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নগরীতে জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি নৌযান চলাচলও বাধাগ্রস্ত হয়। নদীবন্দর এলাকায় ১২ অক্টোবর থেকে ড্রেজিং শুরু হয়েছে। এতে নদীর তলদেশের পলি সরিয়ে ফেলা হবে। বর্ষাকালে এর সুফল পাবে নগরবাসী।

এ জাতীয় আরও খবর