আমরা নিরপেক্ষ নই আমরা সত্যের পক্ষে

১.৮০ কিমি. সড়ক নির্মাণে ৫০ কোটি টাকার প্রস্তাব, ছোট প্রকল্পে বড় জিজ্ঞাসা

news-image

পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ উপেক্ষিত, ব্যয়ের যৌক্তিকতা জানতে চাওয়া হয়েছে * অদ্ভুত ও অস্বাভাবিক ব্যয় প্রস্তাব -ড. জাহিদ হোসেন

সংযোগ সড়ক নির্মাণের ছোট একটি প্রকল্পপ্রস্তাবে ব্যাপক প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। মাত্র এক দশমিক ৮০ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণে ৪৯ কোটি ৭১ লাখ টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়। ‘ভুয়াপুর লিংক সড়ক নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পে ঘটেছে এমন ঘটনা।

গত ৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় উল্লিখিত প্রকল্প প্রস্তাবে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ আমলে না নেওয়া, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অযৌক্তিক ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় প্রস্তাব এবং অযৌক্তিক ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, কিলোমিটারে খরচ পড়বে ২৫ কোটি টাকার বেশি। এটা অদ্ভুত এবং অস্বাভাবিক ব্যয় প্রস্তাব। এত টাকা কোথায় ব্যয় হবে। মনে হচ্ছে দামি কোনো বস্তু দিয়ে এই রাস্তা তৈরি করা হতে পারে। তা না-হলে এত ব্যয় লাগবে কেন? বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা উচিত।

জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সবুর বুধবার যুগান্তরকে বলেন, সুনির্দিষ্টভাবে এ প্রকল্পটি সম্পর্কে এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। তবে সার্বিকভাবে বলতে পারি যে, এ ধরনের প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় ধরার কোনো সুযোগ নেই। নিশ্চয়ই এ প্রকল্পে কোনো গাড়ির প্রস্তাব করা হয়নি বা জ্বালানি বাবদও কোনো খরচ নেই। প্রকল্পটির ব্যয়ের মধ্যে ব্রিজ বা কালভার্ট থাকায় বেশি ব্যয় মনে হচ্ছে। কিন্তু একটি স্টান্ডার্ড রেট শিডিউলের বাইরে ব্যয় প্রাক্কলনের সুযোগ নেই। এ ছাড়া প্রকল্পটি তৈরির পর চিফ ইঞ্জিনিয়ার অফিসে পর্যালোচনা করা হয়। তারপর সেটি পাঠানো হয় মন্ত্রণালয়ে। সেখানে অভ্যন্তরীণ যাচাই কমিটির মাধ্যমে পর্যালোচনা করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। সেখানে পিইসি সভায় অনেক সময় পর্যালোচনার পর কিছু সুপারিশ দেওয়া হয়। সেগুলো প্রতিপালন করে ডিপিপি সংশোধন করা হয়।

সূত্র জানায়, প্রকল্পটির মাধ্যমে ভুয়াপুর-তারাকান্দি জেলা মহাসড়কের বাহাদীপুর লেভেল ক্রসিং থেকে এলেঙ্গা-ভূঞাপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের বিরহাটি লেভেল ক্রসিং পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে। ফলে নিরাপদ, ব্যয়সাশ্রয়ী ও উন্নত যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হবে বলে আশা করেছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রক্রিয়াকরণ শেষে অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে শুরু হয়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর।

পিইসি সভার কার্যপত্রে বলা হয়েছে : পরিকল্পনা কমিশন থেকে গত বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি এক চিঠিতে একান্ত প্রয়োজন হলে ২০২০-২১ অর্থবছরের এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে প্রকল্পটি চলতি অর্থবছরের এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত নেই।

এ ছাড়া মাত্র এক দশমিক ৮০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের জন্য এ ধরনের ক্ষুদ্র পরিসরে প্রকল্প গ্রহণের বিষয়টি একনেক সভার মাধ্যমে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে চলমান বা পাইপলাইনে থাকা কোনো প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয় করে এই এক দশমিক ৮০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন করার অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু তা না করে পুনরায় আলাদা প্রকল্প হিসাবে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, পিইসি সভায় এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, এ কম্পোনেন্টটি চলমান প্রকল্পে যুক্ত করা হলে সে প্রকল্পটি সংশোধন করতে হবে। ফলে সেটির বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। তাই আলাদা প্রকল্প হিসাবেই প্রস্তাব করা হয়েছে। তা ছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনসাধারণের দাবি ও চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে আলাপ-আলোচনার পর আলাদা প্রকল্প হিসাবে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেইসঙ্গে বিভিন্ন সুপারিশ দিয়ে ডিপিপি সংশোধনের জন্য পাঠানা হচ্ছে মন্ত্রণালয়ে।

পিইসি সভার কার্যপত্রে আরও বলা হয়েছে : প্রকল্পের আওতায় ২০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬ দশমিক ৭৫ একর ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণ যৌক্তিকভাবে কমানো প্রয়োজন। সেইসঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ব্যয় প্রাক্কলন সংগ্রহ করে ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) সংযোজন করা প্রয়োজন।

প্রকল্পের আওতায় ৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬৯ মিটার দীর্ঘ একটি পিসি গার্ডার সেতু এবং ১ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ১২ মিটার দীর্ঘ একটি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণের ব্যয় প্রাক্কলন ভিত্তি ও যৌক্তিকতার বিষয়ে সভায় আলোচনা করা যেতে পারে।

এ ছাড়া প্রকল্পে ছয় কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে এক দশমিক ৬১ লাখ ঘনমিটার মাটির কাজের প্রস্তাব করা হয়েছে। যথাযথ সমীক্ষার ভিত্তিতে সড়ক নির্মাণ কাজের পরিমাণ ও ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সভায় আলোচনা করা যেতে পারে।

রক্ষাপ্রদ কাজের অংশ হিসেবে ৫৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা ব্যয়ে ১৫০ মিটার কংক্রিট স্লোপ প্রটেকশন উইথ জিও টেক্সটাইল, ৩৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা ব্যয়ে ১৩০ মিটার আরসিসি টো-ওয়াল এবং ১২ লাখ ৯১ হাজার টাকা ব্যয়ে ১২৫ মিটার আরসিসি প্যালাসাইডিং-এর প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ রক্ষাপ্রদ কাজের যৌক্তিকতা, পরিমাণ ও ব্যয়ের বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। প্রকল্পের আওতায় দুটি ইন্টারসেকশনের জন্য ৩ কোটি ১৭ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু ইন্টারসেকশনের ডিজাইন ডিপিপিতে দেওয়া হয়নি। এক দশমিক ৮০ কিলোমিটার সড়কে দুটি ইন্টারসেকশন উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় এক লাখ ১৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০টি ট্রাফিক সাইন, ৯৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩০টি সাইন পোস্ট, নয় লাখ ৪৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ৪০০টি কংক্রিট গাইড পোস্ট, ১৮ হাজার টাকা ব্যয়ে দুটি কংক্রিট কিলোমিটার পোস্ট এবং ৩ লাখ ২৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ২৯০ মিটার রোড মার্কিং-এর প্রস্তাব করা হয়েছে। সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পিইসি সভায় আলোচনা হতে পারে।